জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভাগ করতে নতুন আইন হচ্ছে

0
4

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ আলাদা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ নতুন করে যাচাই-বাছাই করছে বর্তমান সরকার। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আগামীকাল শনিবার প্রথম বৈঠকে বসছে। যাচাই শেষে নতুন করে জাতীয় সংসদে নতুন বিল আকারে শিগগির উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। আগামী ৭ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনেই যাচাই-বাছাই শেষে নতুন বিল উত্থাপন করা হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। একটি বিভাগ রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করবে এবং অন্যটি রাজস্ব প্রশাসন ও আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে অধ্যাদেশের কিছু কাঠামোগত বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপত্তির মুখে প্রায় দুই মাস আন্দোলন চলে। পরে সরকার ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ দুটি তাৎক্ষণিকভাবে বিল আকারে উত্থাপন না করে আরও যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলো প্রতি বছর জিডিপির অন্তত দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ কারণে রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে এনবিআর বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে এ সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির পাশাপাশি ব্যাংক খাতসহ অন্যান্য সংস্কারে অগ্রগতি না থাকায় আইএমএফ দুই কিস্তিতে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেনি। একই সঙ্গে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আরও ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গঠিত হওয়ার পর থেকেই এনবিআর একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুযায়ী একই প্রতিষ্ঠানের হাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকা কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয় না। এতে স্বার্থের সংঘাত, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।

কার্যপত্রে আরও বলা হয়, করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ এবং জনগণের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবকে এনবিআর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করতে হওয়ায় তাঁকে রাজস্ব আহরণের চেয়ে নীতি প্রণয়নেই বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এতে বলা হয়, ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজস্ব প্রশাসন ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন কার্যক্রম পৃথক করতে একটি আদেশ জারি করলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর এনবিআরের দুই সাবেক চেয়ারম্যান ও তিন সাবেক সদস্যকে নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, বিভিন্ন দলিল ও অংশীজনের মতামত পর্যালোচনা করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন পৃথক করার সুপারিশ দেয়।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে একই কর্মকর্তার দ্বৈত দায়িত্ব আলাদা করার সুপারিশ করা হয়। কমিশন আয়কর, শুল্ক ও আবগারি এবং ভ্যাটের জন্য পৃথক অধিদপ্তর গঠনেরও পরামর্শ দেয়। এসব সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং নীতি বাস্তবায়নপূর্বক রাজস্ব আহরণ পৃথক করার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়।

জানা গেছে, কমিটির সুপারিশে রাজস্ব নীতি বিভাগের সচিব নিয়োগের বিধানেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে অধ্যাদেশে বলা আছে, সরকার উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাকে এ পদে নিয়োগ দিতে পারবে। তবে সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্য নীতি, পরিকল্পনা, রাজস্ব নীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকেই এ পদে নিয়োগ দিতে হবে।

একইভাবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব নিয়োগেও কঠোরতা আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল অধ্যাদেশে রাজস্ব আহরণে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও সংশোধনীতে বলা হয়েছে, রাজস্ব আহরণে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকেই এ পদে নিয়োগ দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিশ্চিত হবে।

কার্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, নতুন দুটি বিভাগ সৃষ্টির জন্য অ্যালোকেশন অব বিজনেস, সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রশাসনিক অনুমোদনের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এ কারণে অধ্যাদেশ কার্যকরের তারিখ পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এ সংক্রান্ত রিট পিটিশন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও ঝুলে আছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ গতকাল  গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই আয়োজিত এক সেমিনারে বলেন, একই সংস্থা যখন করনীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে, তখন সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here