শিশু হত্যা-ধর্ষণে বিক্ষোভ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি জামায়াতের

সু‌প্রিম কোর্ট স‌চিবালয় বিলু‌প্তিকে জা‌তির সঙ্গে সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা, আদালত অবমাননা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর চপেটাঘাত বলে মন্তব্য করেছে জামায়াতে ইসলামী।

বৃহস্প‌তিবার রাজধানীর মগবাজা‌রে দলীয় কার্যাল‌য়ে সংবাদ স‌ম্মেল‌নে এমন মন্তব্য করে জামায়াত।

দল‌টির কর্মপ‌রিষদ সদস্য শিশির মোহাম্মদ মনির ব‌লেন, জুলাই সনদে স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিতের কথা বলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। স্বাধীন বিচার বিভাগ বিএনপি ও জামায়াতসহ সব ফ্যাসিবাদবিরোধী দলের দীর্ঘদিনের চাহিদা ছিল। কিন্তু সরকার এটি বাতিল করে সেই চাহিদার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে। জুলাই সন‌দে বিএন‌পিসহ ৩২‌টি দল পৃথক সৃ‌প্রিম কোর্ট স‌চিবাল‌য় স্থাপ‌নে একমত হ‌য়ে‌ছিল। বর্তমান আইনমন্ত্রী সেসম‌য় আদাল‌তে হলফনামা দি‌য়ে‌ছি‌লেন স‌চিবালয় স্থাপ‌নে।

সংবাদ স‌ম্মেল‌নে উপ‌স্থিত ছি‌লেন জামায়া‌তের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জুবা‌য়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

নিম্ন আদাল‌তের বিচারক‌দের পদোন্নতি, ব‌দলিসহ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দি‌য়ে পৃথক সু‌প্রিম কো‌র্ট স‌চিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় অন্তর্বর্তী সরকা‌রের জা‌রি করা অধ্যাদে‌শে। ত‌বে অধ্যাদে‌শটি পাস করায়‌নি বিএন‌পি সরকার।‌ স‌চিবাল‌য় বিলুপ্ত ক‌রে বিচারক‌দের নিয়ন্ত্রণ আবার আইন মন্ত্রণাল‌য়কে দিয়ে‌ছে। য‌দিও বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশ‌তেহা‌রে সু‌প্রিম কোর্ট পৃথক স‌চিবালয় স্থাপ‌নের প্রতিশ্রু‌তি ছিল।

জাতীয়ভাবে যে বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি হয়েছিল, বিএন‌পি প্রতিশ্রু‌তি ভঙ্গ করায় তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে অ‌ভি‌যোগ ক‌রে শিশির মনির বলেন, এই কাজের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।

জামায়াত স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে জা‌নি‌য়ে শি‌শির ম‌নির ব‌লেন, নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলে নিম্ন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। রাতে কিংবা সন্ধ্যায় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা সাজা দেওয়ার যদি অভিপ্রায় থাকে, তবে আইন মন্ত্রণালয় বিচারক‌দের নিয়ন্ত্রণ নি‌জের হা‌তে রাখ‌বে। আর যদি এই অভিপ্রায় না থাকে তাহলে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করবে।

বিচারকদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তুলে শি‌শির ম‌নির বলেন, পছন্দসই রায় না হলে বিচারক‌দের ওপর চড়াও হওয়ার নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে দিচ্ছেন। অধঃস্তন দুই হাজার বিচারক তাদের কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশে প্রতি ৭৮ হাজর মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক রয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সুপ্রিম কোর্ট এই ৭৮ হাজার মানুষের জন্য বিচারক বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, এই ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এখন ইচ্ছা করলে নিয়োগ দেবে বা সংখ্যা বাড়াবে বা কমাবে। প্রধান বিচারপতির আর কোনো এখতিয়ার নেই।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, রিট মামলার রা‌য়ে হাইকোর্ট গত বছ‌রের ২ সে‌প্টেম্বর আদেশ দেন, ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর আলোকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার অধ্যাদেশ জারি করে। ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের উদ্বোধন করা হয়। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের বিস্তারিত রায় প্রকাশিত হয়ে‌ছে।

তিনি বলেন, অধ্যাদেশ বা‌তিল হ‌লেও আদাল‌তের রায় অনুযায়ী ১৯ এপ্রিল আরেকটি রিট পিটিশন দায়ের করা হ‌য়। সরকার‌কে আদালত অবমাননার নোটিশ দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। এরপরও ১৯ মে বিচার বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। অর্থাৎ বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়ে‌ছে। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগের দুটি অংশ রয়েছে- উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত। কিন্তু নিম্ন আদাল‌তের নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভা‌গের কা‌ছে। বিচারক‌দে‌র ছুটি, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার সব আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচারকরা কোনো আদেশ দিলে তাদের বদলি করে দেন, পদোন্নতি দেন না কিংবা শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ আনা হয়।

শিশির মনির আরও বলেন, এই সমস্যা সমাধানে বিচারক‌দে‌র ছুটি, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণে কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনে প্রধান বিচারপতির অধীনে স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

শিশির মনির বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে রায় যার পক্ষেই যাক না কেন তাতে কোনো আপত্তি নেই। সঠিক বিচারের মাধ্যমে আমাদের আসামি হিসেবে আদালতে দাঁড়াতে হলেও আপত্তি নেই। সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, যা সংবিধান ও আইনসম্মত নয়-বিচারকরা সেটি দেখবেন ও রায় দেবেন। আমি রায়ে অসন্তুষ্ট হলে আপিল করব। কিন্তু বিচারকদের বদলি করে দেব, তাদের পদোন্নতি দেব না, তাদের সুন্দরবন-বান্দরবান বদলি করে দেব- এটি স্বাধীন বিচার বিভাগের চরিত্র হতে পারে না।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর