ঈদের ছুটির পরই বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগামী ১ জুন থেকেই নতুন দর কার্যকর করতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। এ লক্ষ্যে দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ করতে তৎপরতা চালাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ২০ ও ২১ মে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি সম্পন্ন হয়েছে। পাইকারি, খুচরা উভয় পর্যায়েই দাম বাড়ানোর বিষয় অনেকটা নিশ্চিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পাইকারি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৮ থেকে ১৬ শতাংশ দাম বাড়ানো হতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি এক টাকা ২০ পয়সা থেকে এক টাকা ৫০ পয়সা (২১ থেকে ২৯ শতাংশ) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ পড়বে ১২ টাকা ৯১ পয়সা। কিন্তু বর্তমান পাইকারি দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
পিডিবি বলছে, ইউনিটপ্রতি এক টাকা ২০ পয়সা দাম বাড়ানো হলে ঘাটতি কমবে এক হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। আর এক টাকা ৫০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে এক হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
পাইকারি দরে লোকসানের যুক্তি তুলে ধরে বিতরণ কোম্পানিগুলোও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ১০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ইউনিটপ্রতি ৩ পয়সা এবং পিডিবি ২৯ পয়সা বাড়ানোর আবেদন করেছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়ে ৮ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দাম বাড়ানোর বিষয়ে দ্রুত আদেশ দেওয়া হবে। সুনির্দিষ্ট তারিখ বলা যাচ্ছে না। দাম নির্ধারণের বিষয়ে কাজ চলছে। এখনই সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বলা সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ১ জুন থেকে নতুন দর কার্যকর করতে তৎপরতা চলছে।
সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব
দেশের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বিদ্যুৎ সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ৩০ ও ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ও ৪৯ পয়সা করার আবেদন করেছে। তবে কারিগরি কমিটি ৪৪ পয়সা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে।
উৎপাদন খরচ বেড়েছে
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ পৌঁছে সাড়ে ৮ টাকার ঘরে। বর্তমানে গড় উৎপাদন খরচ ১৩ টাকার কাছাকাছি বলে দাবি করা হচ্ছে। ডলারের দাম এবং জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধিকে এ পরিস্থিতির কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, অনিয়ম, দুর্নীতি, অসম চুক্তি ও অব্যবস্থাপনার কারণেও বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বেড়েছে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। তখন পাইকারি বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি গড় দাম ছয় টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়।
শুনানিতে দাম বাড়ানোর বিরোধিতা
গত ২০ ও ২১ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা ও অপচয়ের বোঝা এখন সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপানো হচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার ও বিদ্যুৎ খাতের সংস্থাগুলো প্রতিবারই ভর্তুকির চাপের যুক্তি তুলে ধরে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আনে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, সংসার চালানোর কষ্ট কিংবা ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, শিল্প ও রপ্তানি খাত এমনিতেই নানা চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ালে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বিকেএমইএর এক নেতা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি দাম শিল্পকারখানাকে আরও সংকটে ফেলবে।




