শিল্পকারখানার একাংশে ছুটির পর যাত্রীর ঢলে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে গতকাল সোমবার বিকেল থেকে যানজট শুরু হয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার প্রবেশপথ বলে খ্যাত গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় অন্তত ২০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে যানজট ছিল। বৃষ্টিতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত দুপুরের পর ধীরগতি ও থেমে থেমে যানজট ছিল।
আজ মঙ্গলবার গাজীপুরের ৪৫ শতাংশ কলকারখানায় ঈদের ছুটি হবে। তাই আজ ভোগান্তির শঙ্কা আরও বেশি। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যানজট ছিল না। গতকাল ঈদযাত্রায় বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনায় ৩১ জন নিহত হয়েছেন।
যাত্রীর চাপ বাড়ায় গতকাল বিকেল থেকে বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বাস সংকটে ট্রাক, পিকআপে হাজার হাজার যাত্রী গ্রামের পথ ধরেন। বৃষ্টিতে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটে চলা লোকাল বাসগুলো মহাসড়কে যাত্রী পরিবহনে নামলে বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পায়।
আগের দিনগুলোর তুলনায় গতকাল ট্রেনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। সন্ধ্যার পর উত্তরবঙ্গ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ট্রেনগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাজারো যাত্রী ছাদে ওঠেন।
আগামী বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। ভোগান্তি এড়াতে ঈদের আগে তিন দিন ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার, যাতে ধাপে ধাপে যাত্রীরা শহর ছাড়তে পারেন। রমজানে ঈদের চার দিন ছুটি ছিল। তবে শেষদিকে দুর্ভোগ হয়। এবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে মহাসড়কের পাশে গরুর হাট, কলকারখানায় ছুটির পর যাত্রীর ঢল এবং বৃষ্টির কারণে।
যানজটে ভোগান্তি দুই মহাসড়কে
গতকাল ৪২ শতাংশ কলকারখানায় ছুটি হয়েছে। এতে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের চন্দ্রা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে জৈনা বাজার পর্যন্ত অংশে যাত্রীর ঢল নামে। দিনভর বৃষ্টিতে সড়কে কাদাপানিতে গাড়ির গতি কমে ভোগান্তি আরও বাড়ে।
একই পোশাক কারখানায় চাকরি করেন হেলাল উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী আসমা আক্তার। বেতন-বোনাস পেয়ে স্বামী-স্ত্রী সোমবার সকালেই বাসা থেকে বের হন গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু তাদের ঈদযাত্রায় বাগড়া লাগায় জ্যৈষ্ঠের বৃষ্টি। তুমুল বর্ষণে ভিজে ফিরে যান বাসায়।
গাজীপুরে সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানার মধ্যে গতকাল থেকে ১ হাজার ৪৭টিতে ছুটি শুরু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ৪৫ ভাগ ও আগামীকাল বুধবার ৮ ভাগ কারখানায় ছুটি হবে। তাই আজও মহাসড়ক দুটিতে যানবাহনের চাপ থাকবে বলে ধারণা করছে পুলিশ। গাজীপুর শিল্প পুলিশ বলছে, প্রথম ধাপের ছুটি পেয়ে সোমবার ৩০ লাখ শ্রমিকের অন্তত ১৫ লাখ বাড়ির পথে যাত্রা করেছেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর সুপার মো. আমজাদ হোসাইন সমকালকে বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট নিরসন ও চাপ কমানোর জন্য এবারও তিন ধাপে কারখানাগুলোর ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় মাওনা চৌরাস্তা, ভবানীপুর, বাঘের বাজার ও নয়নপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুপাশেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ধীরগতিতে চলছে গাড়িগুলো। শ্রমিকরা বাস, ট্রাক, পিকআপসহ যিনি যেভাবে পারছেন, যাচ্ছেন।
চন্দ্রায় যাত্রীদের ঢল নামে বিকেল থেকেই। অন্তত ২০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে যানজট ছিল। পরিবহনগুলোতে কয়েক গুণ ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। তুমুল বৃষ্টিতে ভোগান্তি বেড়ে যায়।
যাত্রীরা জানান, ইপিজেড থেকে চন্দ্রার ভাড়া ২০-৩০ টাকা; নেওয়া হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। টাঙ্গাইলের ভাড়া সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা ও উত্তরবঙ্গে সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
নাওজোড় হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম বলেন, দুপুর থেকেই মহাসড়কে চাপ বেড়ে যায়। বৃষ্টি কিছুটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মাওনা হাইওয়ে থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের প্রচুর চাপ। তবে আটকে থাকছে না গাড়ি।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, মঙ্গলবার ৪৫ শতাংশ কারখানায় ছুটি হবে– মাথায় রেখেই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গতকাল আশুলিয়ায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ১৩ কিলোমিটার সড়কে যানজট ছিল। একযোগে যাত্রীরা রাস্তায় নামায় এবং যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় এ যানজট হয়। মৌমিতা পরিবহনের চালক ইকবাল হোসেন বলেন, দুপুরের পর থেকে সড়কে যাত্রীর চাপ বেড়েছে।
সাভার হাইওয়ে থানার ওসি শেখ শাহজাহান বলেন, বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানোর কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে যানজট শুরু হয়ে বাইপাইল পর্যন্ত গেছে।
সোমবার সকাল থেকে ভিড় ছিল চট্টগ্রাম নগরীর দূরপাল্লার বাসস্ট্যান্ডগুলোতে। তীব্র গরম উপেক্ষা করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নগর ছাড়ছেন হাজারো মানুষ। শাহ আমানত সেতু দিয়ে নগর থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুট ছাড়াও কক্সবাজার-টেকনাফের বাস চলাচল করে। দুপুরে সেতু এবং আশপাশে প্রায় দুই কিলোমিটার যানজট হয়।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে টেকনাফে যাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরমান হোসেন। স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে শাহ আমানত সেতুর বাস কাউন্টারে টিকিট নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আরমান হোসেন বলেন, সুযোগ বুঝে বাড়তি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যানজট না থাকলেও বাস সংকটে গতকাল দুর্ভোগ হয়েছে যাত্রীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকেও বাস পাননি তারা। একাধিক যাত্রী জানান, ২৫০ টাকার ভাড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
ঘাটেও যানজট
পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাটে সোমবার সকাল থেকে উপচে পড়া ভিড় ছিল। যাত্রীবাহী যানবাহনের সারি পাটুরিয়া ঘাট এলাকা থেকে চরেরডাঙ্গা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার ছাড়ায়।
ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌরুটে ১৭টি ফেরি দিয়ে যানবাহন ও যাত্রী পার করা হচ্ছে। অন্যদিকে আরিচা-নগরবাড়ী নৌরুটে পাঁচটি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পার করা হচ্ছে।
গতকাল ঢাকার গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা রাজবাড়ীগামী হানিফ বাসের চালক মতিউর রহমান বলেন, গাবতলী থেকে সকাল ৭টায় বাস ছেড়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পাটুরিয়া ঘাটে আসি। যানজটের কারণে দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও ফেরিতে উঠতে পারিনি।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা কুষ্টিয়াগামী ট্রাকচালক সুমন আহম্মেদ বলেন, দুপুর ১২টার দিকে পাটুরিয়া ঘাটে আসি। যানজটের কারণে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও ফেরিতে উঠতে পারিনি।
আরিচা অফিসের বিআইডব্লিউটিসির ডিজিএম আব্দুল সালাম বলেন, সোমবার সকাল থেকে যাত্রী ও যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘাট পরিদর্শনে এসে নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেছেন, স্বস্তিতেই ঘরমুখী যাত্রীরা বাড়ি যাচ্ছেন।
চাপ বেড়েছে সেতুতে
ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে পদ্মা সেতুতে সোমবার দিনে গাড়ি চলাচল কম থাকলেও সন্ধ্যার আগে থেকে চাপ বাড়ে। ১২ ঘণ্টায় টোল আদায় হয় ২ কোটি ৪১ লাখ ৮০ হাজার ৪৫০ টাকা, যা সাধারণ সময়ের প্রায় দ্বিগুণ।
টাঙ্গাইলে যমুনা সেতুতে গড়ে দিনে ২০ হাজার গাড়ি চলাচল করে। সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৯ হাজার ৯১৯টি যানবাহন পারাপার হয়।




