বাজেট ২০২৬-২৭ মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়বে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও ৫ শতাংশের প্রাথমিক কর ধাপ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ১০ শতাংশ করের প্রাথমিক ধাপ ঠিক করা হয়েছে। বাজেটের এ প্রস্তাবে মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়বে। অন্যদিকে, বিনিয়োগ করলে ব্যক্তি করদাতারা যে রেয়াত পান, তাও কমানো হয়েছে। এটিও মধ্যবিত্তের করের চাপ বাড়াবে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রথম পৌনে চার লাখ টাকা করমুক্ত। পরবর্তী তিন লাখে ১০ শতাংশ, পরের চার লাখে ১৫ শতাংশ, পরের পাঁচ লাখে ২০ শতাংশ এবং পরের ২০ লাখ টাকা আয়ে ২৫ শতাংশ আয়কর দিতে হবে। অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বেড়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে গিয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা হবে এবং সর্বোচ্চ কর হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয় আরও বাড়ানোর পক্ষে বলছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের প্রকৃত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে, মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতারা সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

গতকাল বাজেট পেশ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন কর প্রস্তাবে ব্যক্তি করদাতার জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। তবে এ সামান্য স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে ৫ শতাংশের প্রাথমিক কর ধাপের বিলোপ। এর সঙ্গে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করায় করদাতার প্রকৃত দায় আরও বেড়েছে। সিপিডি মনে করে, বিদ্যমান বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানো উচিত ছিল।

ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআই বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রভাব প্রস্তাবিত সীমায় পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সংগঠনটির মতে, কর স্ল্যাব সাতটি থেকে ছয়টিতে নামিয়ে আনা এবং সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ বিলুপ্ত করে ১০ শতাংশ নির্ধারণের ফলে করদাতাদের একটি বড় অংশের ওপর তাৎক্ষণিক করের চাপ বাড়বে।

করদায় কেমন হবে

কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া সমকালকে বলেন, ৫ শতাংশের কর ধাপটি বিলুপ্ত করা এবং নির্দিষ্ট বিনিয়োগে কর রেয়াত ৫ শতাংশ কমানোর কারণে মাসিক ৭৪ হাজার বেতনের নাগরিকের করভার সর্বাধিক ৪৯ শতাংশ বাড়বে।

এর ব্যাখ্যায় তিনি জানান, যার মাসিক আয় ৭৪ হাজার টাকা, তার উৎসব বোনাসসহ তার বার্ষিক করযোগ্য আয় হবে ৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এই আয় ধাপে থাকা একজন করদাতার করযোগ্য আয় দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪২ হাজার টাকা। এ আয়ে বিদ্যমান কর দায় ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। প্রস্তাবিত কর কাঠামোতে এ কর দায় সরাসরি বেড়ে দাঁড়াবে সাত হাজার ৪৫৪ টাকায়। এতে কর দায় বাড়ছে ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এ স্তরের করদাতার করভার প্রায় অর্ধেক বেড়ে গেছে।

তিনি জানান, যার মাসিক আয় ৯৮ হাজার টাকা, তার বার্ষিক করযোগ্য আয় হবে পৌনে ১৩ লাখ। এই আয় ধাপে করদাতার করযোগ্য আয় হবে সাড়ে আট লাখ টাকা। আগের কর দায় ছিল ১৯ হাজার ৫০৪ টাকা, যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ হাজার ৭৫৪ টাকা।

এ ক্ষেত্রে করভার বাড়বে ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যার মাসিক আয় এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৬৫ টাকা, তার করযোগ্য বর্তমানের সাড়ে ৭৩ হাজার টাকা বা সাড়ে ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬ হাজার টাকা হবে। আর যার মাসিক আয় আড়াই লাখ টাকা বা তার বেশি, তাদের কর দায় তিন লাখ ৬২ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ বেড়ে চার লাখ টাকা হবে। অর্থাৎ, আয় যত বেশি, করভার তত কম বাড়বে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, উচ্চ আয়ের মানুষরা টাকার অঙ্কে কর বেশি দেন। তা সত্ত্বেও তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট অর্থ থাকে। অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা চালিয়ে নেওয়াই কষ্ট। এ অবস্থায় সরকার যদি এভাবে করভার চাপায়, তাহলে অনেকেই কর দিতে চাইবেন না। দেশে বর্তমানে কর দেওয়া মানুষের চেয়ে করযোগ্য মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কারণ এটি বলে মনে করেন তিনি।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর