গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। উচ্চ খেলাপির কারণে ঋণ বিতরণে সতর্কতা দেখাচ্ছে ব্যাংক। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। ঝুঁকিমুক্ত বিবেচনায় ভালো ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দেওয়ায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতে রেকর্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য তৈরি হয়েছে। গত জুন শেষে প্রথমবারের মতো উদ্বৃত্ত তারল্য চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে না পারায় মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছিল। বর্তমানে এ প্রবণতা কমেছে। ঘরের টাকা ব্যাংকে ফিরছে। তবে এই অর্থ আসছে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকের কাছে। ভালো ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদ দিলেও যথাসময়ে টাকা ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা থেকে সেখানেই টাকা রাখছে বেশির ভাগ মানুষ। ফলে ঋণ বিতরণও করছে মূলত হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকেই উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় অংশ।
উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই নগদ বা তাৎক্ষণিক ঋণযোগ্য তহবিল নয়; বরং উদ্বৃত্ত অর্থের অধিকাংশই বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে আছে। বিল ও বন্ডের বিপরীতে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এসএলআর বা সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ সংরক্ষণ করে থাকে। বর্তমানে একটি ব্যাংকের তলবি ও মেয়াদি দায়ের ১৩ শতাংশ এসএলআর হিসেবে রাখতে হয়। এ ছাড়া নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআর রাখতে হয় ৪ শতাংশ। এ দুয়ের অতিরিক্ত অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত। প্রয়োজন হলে বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংকগুলো যে কোনো সময় নগদায়ন করতে পারে। যে কারণে এই অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী– গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে চার লাখ আট হাজার কোটি টাকা। আগের মাস মে শেষে যা ছিল তিন লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ছয় মাস আগে গত ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল তিন লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০২৪ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল এক লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুন শেষে যা এক লাখ ৬৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা ছিল। ২০২২ সালের জুন শেষে ছিল দুই লাখ তিন হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরফান আলী সমকালকে বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি না হওয়ায় উদ্যোক্তারা এখন ঋণ নিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আবার এখন যে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে, এর বেশির ভাগই কয়েকটি ব্যাংকের কাছে। এসব ব্যাংক ঝুঁকি না নিয়ে সরকারি বিল, বন্ডে টাকা খাটানোর ওপর জোর দিয়েছে। এ প্রবণতার ফলে শিল্প উৎপাদন কমে যাবে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগসহ অবকাঠামো ঠিক করতে না পারলে বিনিয়োগ চাহিদা বাড়বে না। এখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, ঋণের সুদহার কমে আসবে। তবে দুর্বল ব্যাংকের কারণে আমানতের সুদ অনেক বেশি কমবে না। প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ঋণ ও আমানতের মধ্যকার সুদহারের সর্বোচ্চ ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে কম সুদের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তাতে তেমন সাড়া মিলছে না। এর মধ্যে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে। এর আগে করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর ব্যাংক খাতে ঋণ চাহিদা ব্যাপক কমে যায়। ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ভর্তুকি সুদে ১২টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৯৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেশির ভাগ প্রণোদনা তহবিলের সুদহার ছিল ৪ শতাংশ। এরপরও ঋণ সেভাবে বাড়েনি। যে কারণে ২০২১ সাল শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে দুই লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকায় ওঠে। ওই সময় পর্যন্ত উদ্বৃত্ত তারল্যের যা ছিল রেকর্ড। তখন বিতরণ করা ঋণের অপব্যবহারের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।


