প্রথম বর্ষ ভালোভাবে শেষ করলেও দ্বিতীয় বর্ষে এসে বিড়ম্বনার মুখে পড়েন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী পুতুল (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ জেলার এক শিক্ষার্থীর দ্বারা তিনি নিয়মিত হয়রানির শিকার হন। একপর্যায়ে মোবাইল নম্বর বদলাতেও বাধ্য হন পুতুল। এতেও কোনো সুরাহা না হলে পরে বিভাগীয় সিনিয়রদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। যদিও এর মধ্যে দীর্ঘ সময় আতঙ্কে কেটেছে পুতুলের।
এ ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই ছেলে আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে দীর্ঘদিন বিরক্ত করত। টিউশনিতে যাওয়ার পথে আমার পিছু নিত।
হলের পাশেও দাঁড়িয়ে থাকত। দীর্ঘদিন আমাকে এসব ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের সম্মান রক্ষায় প্রকাশ্যে কারও কাছে অভিযোগও করতে পারিনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী সেলে অভিযোগ করেছেন কি না জানতে চাইলে পুতুল বলেন, ‘নিপীড়নবিরোধী সেল আছে, সেটাই তো জানতাম না। কখনও কেউ বলেনি। এ বিষয়ে কোনো প্রচারণাও দেখিনি।’
পুতুলের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই লোকলজ্জার ভয়ে এ ধরনের হয়রানি নীরবে সহ্য করেন। তারা নিপীড়নবিরোধী সেল নিয়ে জানেন না। ফলে অনেক ঘটনাই থেকে যায় আড়ালে।
অভিযোগ বাক্স খোলাই হয় না
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলে সাতজন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে চারজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একজন রেজিস্ট্রার অফিসের প্রতিনিধি রয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ‘রফিক ভবন, উপাচার্য ভবনসহ কয়েকটি স্থানে অভিযোগ বাক্স থাকলেও সেগুলো নিয়মিত খোলা হয় না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদিবা নাওমি বলেন, ‘এই সেল সম্পর্কে খুব কম শিক্ষার্থীই জানে। আমিও জানতাম না। অনেক আগে আমার এক সিনিয়র আপু বাক্সে অভিযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটার কোনো সাড়া নাকি পাওয়া যায়নি।’
শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগ নিয়ে দ্বিমত জানিয়ে সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক পারভীন আক্তার জেমি সমকালকে বলেন, ‘২০২৫ সালের শুরুতে আমি এর দায়িত্ব নেই। অভিযোগ বাক্স দীর্ঘদিন খোলা হয়নি- এমন অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। তবে বাক্সের চাবি ছাত্রকল্যাণ দপ্তর বা রেজিস্ট্রার অফিসের কাছে থাকায় কিছুটা সময় লাগতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আয়োজিত কর্মশালার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা। ইতোমধ্যে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে। সেগুলোর তদন্ত চলমান।’
জকসুর উদ্যোগও শূন্য
জকসু নির্বাচনের আগে বিজয়ী প্যানেলের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা। নির্বাচনের পাঁচ মাস পরও নারী শিক্ষার্থীবান্ধব সেমিনার এবং নিপীড়নবিরোধী উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে সামনে বেশকিছু পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ওই প্যানেল থেকে নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘খুব শিগগিরই একটি অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে, যার মাধ্যমে পুরান ঢাকার শিক্ষার্থীরা কোনো সমস্যায় পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ জানাতে পারবেন। প্ল্যাটফর্মটি সংশ্লিষ্ট থানা ও প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।’
উপাচার্য যা বললেন
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন সমকালকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি বিভাগে অ্যান্টি-হ্যারাসমেন্ট অভিযোগ বাক্স বসানো হয়েছে। এসব বাক্সে জমা পড়া অভিযোগ প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট ডিন অফিসে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’




