ব্যবসায় মূলধন জোগানে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ব্যবস্থার পরিবর্তে শেয়ারবাজারমুখী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), বন্ড ইস্যু কিংবা রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা যেতে পারে। এতে ব্যাংক ঋণের উচ্চহারের সুদের চাপ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব, যা ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় অনেক কমিয়ে দেবে।
গতকাল রোববার ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন: নীতি সংস্কার থেকে কার্যকর বাস্তবায়ন’ শিরোনামের এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের সংগঠন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন অ্যামচ্যাম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল।
দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, গবেষকসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসা পরিচালনায় জ্বালানি সংকট, দুর্নীতি, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, কাস্টমসে হয়রানিসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন তারা। সহজে ব্যবসা পরিচালনা ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে নতুন করে সংস্কার-নীতি নেওয়ার আগে বিদ্যমান সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়ন চেয়েছেন তারা।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের পর ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে। আরও ভালো কিছু আশা করছে সরকার।
শিল্পকারখানা পরিচালনায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সমস্যার সমাধানে আরও অন্তত দুই বছর সময় লেগে যেতে পারে। উত্তরাধিকার সূত্রে জ্বালানির যে সংকট সরকার পেয়েছে, তা ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে সমাধানযোগ্য নয়। এ জন্য আরও অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী ব্যবসা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার মাধ্যমে আরও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি চলমান নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা যাতে নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরতে পারেন, সে জন্য নেওয়া ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন।
করব্যবস্থা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও অটোমেশনের মাধ্যমে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ কাঠামো গড়ে তুলতে সংস্কার কার্যক্রম চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ম মেনে পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ, কর পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং করব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি করব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে অ্যামচ্যাম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যেসব মৌলিক বিষয় বিবেচনা করেন, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশে রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও প্রকৃত বিনিয়োগে রূপ দিতে নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিক ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
আলোচনায় এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য মূলধনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার ভিত্তি হলো একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাণিজ্য আরও সহজ করা গেলে দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
কয়েকজন উদ্যোক্তা অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম রাজস্ব আহরণের মধ্যে কীভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করা ও মূল্যস্ফীত সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা যাবে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার করে আওতা বাড়াচ্ছে। কর ফাঁকি রোধে বিভিন্ন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অটোমেটেড করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে করব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা আসবে। রাজস্ব আহরণ বাড়বে।


