দাদির বার্তায় অশ্রুসজল ভিনি

0
3

আলো-আঁধারে ২৫ বছরের জীবন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতার পাণ্ডুলিপি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের। কুঁড়েঘরের শৈশব, এখন বিলাসী জীবন। এক জীবনে খালি পায়ে খেলে এখন মাঠে নামেন লাখ টাকার বুট পরে। জীবন-সংগ্রামে জয়ী হওয়ায় অভাব পালিয়েছে পেছনের দরজা দিয়ে, এসেছে প্রাচুর্য। আরও কত পরিবর্তনই না ঘটে গেছে ভিনিসিয়ুসের জীবনে! এই যাপিত জীবনে চাকচিক্য তাঁকে ভোলাতে পারেনি সাদাকালো শৈশব-কৈশোরকে। সুখের সমান্তরাল ছিল দুঃখ-কষ্ট-অপমান। রঙের বেড়া, জাতের কাঁটায় সমাজ দাগ কেটে দিলেও তিনি ছিলেন লক্ষ্যে অবিচল।

ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস ফেলে আসা কোনো কিছুই ভোলেননি। তাই গ্লোবো টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণে হন আবেগি। তিনি স্মৃতির সাগর সেচে যে মণি-মুক্তা তুলে আনলেন, তার কিছু কালো, কিছু স্বর্ণালি। সাও গনসালোর ছোট্ট কুটিরে তাঁর দাদির পাশে শুয়ে কেটেছে ১৬ বছর পর্যন্ত। জীবন উত্তরণে দাদিই ছিলেন পাঠশালা, মস্ত পাঠাগার। সাক্ষাৎকার চলাকালে সঞ্চালক একটি রেকর্ড করা ভিডিও দেখান ভিনিসিয়ুসকে। তাঁর দাদি ডোনা নিলজার শোনাচ্ছিলেন নাতির গল্প, ‘ও ছিল লাজুক প্রকৃতির। বলই ছিল ওর প্রধান আকর্ষণ। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ও আমার পাশে ঘুমাত। মাঝেমধ্যে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরতাম আর ও দেখত যে আমার পাশে আছে কিনা।’ নাতির জন্য একটি আন্তরিক বার্তাও উৎসর্গ করেন তিনি, ‘ভিনি, আমার নাতি, আওয়ার লেডি অব আপারেসিডা তোমাকে সর্বদা রক্ষা করুন। তোমার দাদি তোমাকে অনেক, অনেক, অনেক বেশি ভালোবাসে।’

২০২৬ বিশ্বকাপে দাদির কাছ থেকে পাওয়া বার্তা জল আনে ভিনিসিয়ুসের চোখে। রিয়াল মাদ্রিদের এই উইঙ্গারের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। কাঁপা গলায় তিনি স্মরণ করেন শৈশবের সেই সব দিনরাত্রি, ‘আমার জীবনে পিতামহীর গুরুত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই তিনি আমার সবকিছু ছিলেন।’ আসলে হৃদয়ের গভীরে জমা কষ্টগুলো যখন ভাষা পায়, তখন তা অশ্রু হয়ে ঝরে। সেই কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণে জমে থাকা কষ্টগুলো ভাষা পেয়েছিল ভিনিসিয়ুসের ঠোঁটে-চোখে।

স্মৃতিকাতর ভিনিসিয়ুস জানান, পিতামহীই ছিলেন তাঁর সব, ‘আমাদের বাড়ি খুব ছোট ছিল। আমি ঠাকুরমার সঙ্গেই ঘুমাতাম। তিনি আমাদের জন্য সবকিছু করেছেন। আজও তাঁকে নিয়ে বলতে গেলে ভাষা হারিয়ে ফেলি। তিনি আমার জীবন গড়ে দিয়েছেন। তিনি এমন একজন, যিনি আমার জীবনে ছাপ রেখেছেন। আমি জানি, একসময় মানুষকে চলে যেতে হয়। তাই আমি প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর (দাদি) ও আমার পরিবারের সঙ্গে বাঁচি, যারা আমার স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য সবকিছু করেছে।’

ভিনিসিয়ুস শুধু ফুটবলটাই ভালো খেলেন না, জীবনবোধও প্রখর। মাঠে বর্ণবাদের শিকার হয়ে প্রতিবাদী হয়েছেন, ‘কালো কিংবা ধলো চামড়া, সবই তো তার সৃষ্টি– মাটির।’ ব্রাজিল উইঙ্গারের প্রত্যাশা, ‘আমি চাই আগামী প্রজন্মকে আর বর্ণবিদ্বেষের যন্ত্রণা সহ্য করতে না হয়।’ তাঁর কণ্ঠে মিশে ছিল প্রতিজ্ঞার সুর, ‘মাঠে নিজের সেরাটা দিতে চাই, সাফল্যও পেতে চাই। তবে তার পাশাপাশি তরুণদের অনুপ্রাণিত করা এবং যাদের কথা বলার সুযোগ নেই, সেই সব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের হয়ে কণ্ঠস্বর তোলাও আমার দায়িত্ব। সেই লড়াই আমি চালিয়ে যেতে চাই।’ যতবার হোঁচট খাবে, ততবার ওঠো জেগে; কঠিন লড়াইয়ে মানুষ যায় যে এগিয়ে বেগে– এই দীক্ষায় পথচলা ভিনিসিয়ুসের স্বপ্ন বিশ্বকাপ জয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here