ময়মনসিংহের নান্দাইলে ৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণসহ উন্নয়নকাজ কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি। এতে বরাদ্দের পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত গেছে। এদিকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে বিদ্যালয়গুলোয় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, তারা বারবার তাগাদা দিয়েও কাজ শেষ করাতে পারেননি। ঠিকাদাররা বলছেন, এ পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে তা তারা নিজেদের টাকায় করেছেন। এখন বরাদ্দের অর্থ ফেরত গেলে তাদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে পিইডিপির (প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প) অধীনে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এসব কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও এখন পর্যন্ত তা শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট অফিস জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের পর বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ না করায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষে বরাদ্দের টাকা ফেরত গেছে। উন্নয়নকাজের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান শিক্ষকের কক্ষ নির্মাণ।
উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, তাদের তত্ত্বাবধানে উপজেলায় পিইডিপি প্রকল্পের অধীন দুই কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া রয়েছে ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬টি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর এবং দুই কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের আলাদা কক্ষ নির্মাণ। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এসব প্রকল্প ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারদের গাফিলতির কারণে নির্দিষ্ট সময়েও কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিকবার সময় বৃদ্ধি করা হলেও এখনও কাজ শেষ হয়নি। কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ ২০ শতাংশও শেষ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
নির্মাণকাজ বাকি থাকা কয়েকটি বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চণ্ডীপাশা মডেল সরকারি বিদ্যালয়, ধীতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর ভেলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
কুরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভবন নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গাঁথুনির জন্য মাটির ওপর ভিম তৈরি করে সেভাবেই ফেলে রাখা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আবু বকর ছিদ্দিক জানান, একটি ভবনের অভাবে পাঠদানে তাদের খুব সমস্যা হচ্ছে।
দেউলডাংরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম জানান, বারবার তাগাদা দেওয়ার পর সম্প্রতি ঠিকাদারের লোকজন দরজা জানালা লাগিয়েছে, প্লাস্টার এখনও বাকি রয়েছে। হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে প্রধান শিক্ষকের জন্য তিন তলায় পৃথক কক্ষ নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রধান শিক্ষক বেগম নুরুন্নাহার জানান, প্রতি মাসে প্রকৌশল অফিসে গিয়ে তাগাদা দিয়েও তিনি কোনো সুফল পাচ্ছেন না। কান্দাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শেষ হয়নি। প্রধান শিক্ষক জুলফিকার আলী ভূঁইয়া জানান, কাজটি শেষ না হওয়াতে তিনি বিদ্যালয়টিকে সুন্দর করে গোছাতে পারছেন না। পুরহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান ফকির জানান, তাঁর বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের কাজ দীর্ঘদিন অর্ধেক করে ফেলে রাখা হয়েছে।
ঠিকাদারদের একজন আমরু মিয়া জানান, তিনি বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ পেয়েছেন। প্রায় সবগুলোর কাজই শেষের পথে, কয়েকটির সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। জাহাঙ্গীরপুর বালিয়া পুকুর বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম (বড় সাইফুল) জানান, সীমানা জটিলতার কারণে সেখানে এতদিন কাজ শুরু করা যায়নি। কিছু দিন আগে জায়গা বুঝে পেয়ে তিনি কাজ শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার জানান, নিজেদের টাকায় কাজ করেছেন, বরাদ্দ ফেরত গেলে তারা মাঠে মারা যাবেন।
এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া পিয়াল জানান, ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বৃদ্ধির পরও কাজ শেষ হয়নি। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত গেছে। আগামীতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে পুনরায় টেন্ডার দিয়ে কাজ করতে হবে।




