বন্যায় তছনছ চট্টগ্রামের কৃষি, প্রণোদনার অপেক্ষায় কৃষক ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে

ঋণ নিয়ে ও নিজের সঞ্চিত অর্থ লগ্নি করে আউশের ধান চাষ, ক্ষেত-খামার করেছিলেন চট্টগ্রামের অসংখ্য কৃষক। বৃষ্টি ও বন্যায় এসব চাষাবাদ তলিয়ে গেলে সবজির সঙ্গে সঙ্গে তাদের সব হিসাবনিকাশও নষ্ট হয়ে গেছে। চাষের মাছ বন্যায় ভেসে যাওয়াতে চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা। পরের মৌসুমের আবাদ নিয়েও রাজ্যের অনিশ্চয়তা ভর করেছে তাদের মনে। সরকারি সহায়তা ছাড়া উদ্ধারপ্রাপ্তির আর কোনো সহায় দেখছেন না এই চাষিরা।

কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশের শঙ্খ নদের চরে সবজি চাষ করছেন মোহাম্মদ হাসান (৩২)। চলতি মৌসুমেও এই চরে প্রায় পাঁচ কানি জমিতে ঢ্যাঁড়শ, লাউ, ঝিঙা, চিচিঙ্গাসহ নানান সবজি চাষ করেছিলেন। নিজের সঞ্চিত ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে স্থানীয় একটি সমবায় সমিতি থেকে চড়া সুদে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকায় সবজিক্ষেত করেছিলেন এই চাষি। কিন্তু বন্যার পানিতে ডুবে যায় তাঁর ক্ষেত। পানি নামার পর দেখতে পান তাঁর বেশির ভাগ সবজি পচে গেছে; যা অবশিষ্ট ছিল, তাও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামের মধ্যবয়সী বাসিন্দা মওলানা মো. হামিদ একজন মাছচাষি। ১৫ লাখ টাকা খাটিয়ে এলাকার ছোট-বড় কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়েছেন তিনি। নিজের সাত লাখ টাকার পাশাপাশি সমবায় সমিতি ও একটি এনজিও থেকে আট লাখ টাকা ঋণ করেছেন। দিনে দিনে তাঁর পুকুরের মাছ বড় হচ্ছিল। কিন্তু বন্যায় চোখের সামনেই পুকুরগুলো তলিয়ে গেলে সব মাছ বেরিয়ে যায়। এখন পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা এই ক্ষুদ্র মৎস্য খামারি।

সমকালের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মওলানা মো. হামিদ ও মো. হাসানের চোখে পানি টলমল করছিল; গলাও ধরে আসছিল তাদের। হামিদ বলেন, ‘পুকুর থেকে আসা লাভের টাকায় সংসার চলত। এবার পুকুরে রুই, কাতলা ও তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যায় পুকুর ডুবে সব মাছ বেরিয়ে গেছে। এখন কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, আর কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।’

মো. হাসান বলেন, ‘শঙ্খচরে সবজি চাষ করেই আমি জীবিকা নির্বাহ করি, সংসার চালাই। এখন ধার-দেনা কীভাবে মেটাব? কীভাবে সংসার চলবে? বুঝতে পারছি না। সরকারের সহায়তা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই আমাদের।’

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম জেলায় ১৬ হাজার ২৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজি ও আউশ ধানের আবাদ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। জেলার ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে ৪৩ হাজার ৫০ টন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন বীজতলায় ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকার। ৫২০ টন আদা নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। হলুদের ১১৮ দশমিক ৩৬ টন উৎপাদন নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ৭৮ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি পশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। টাকার অঙ্কে এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১টি খামার।

৬ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে ৭ জুলাই বিকেল ৩টার মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় চট্টগ্রামে। টানা কয়েক দিনের অতিভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ধানি জমি, সবজিক্ষেত, মাছের প্রজেক্ট, পোল্ট্রি ফার্ম আর পানের বরজ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বন্যায় শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫১১ জনই কৃষক। তবে জেলা প্রশাসনের হিসাবে,  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানিয়েছেন, ‘কেবল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষি খাতেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার। কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন তিন পার্বত্য জেলাসহ অন্যান্য জেলায়ও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ আশ্বাস দিয়ে অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনাসহ সব ধরনের সহায়তা দিতে কাজ চলছে।’

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর