ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে ৭৯টি প্লটের মধ্যে ৫১টিই ফাঁকা পড়ে আছে। এগুলোতে কোনো শিল্পকারখানা বা উৎপাদন নেই। এ প্লটগুলোর মধ্যে ২৫টিই ফরচুন গ্রুপের। তিন বছর আগে বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি তারা। এমনকি বিসিকের প্রায় দেড় কোটি টাকা পাওনাও পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি।
বকেয়া কিস্তির টাকা আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বিহিত করতে পারছেন না বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কর্মকর্তারা। বিসিক কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
২০২৩ সালে ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে ৭৯টি প্লটের মধ্যে ফরচুন গ্রুপের নামেই বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৫টি। ফরচুনের নামে বরাদ্দ করা প্লটে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের লে-আউট দাখিল ও জমির কিস্তির টাকা বাবদ বকেয়া এক কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ না করলেও বরাদ্দ প্লটগুলো এখনও বাতিল করা হয়নি। বিসিক একাধিকবার এ টাকা পরিশোধের নোটিশ দিলেও পাওনা পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেই মালিকপক্ষের। এ ছাড়া শিল্পনগরীতে চালু থাকা বিভিন্ন শিল্প ইউনিটগুলোর কাছে বকেয়া পড়েছে আরও এক কোটি টাকা।
২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পনগরীর মোট জমির পরিমাণ ১১.৮ একর। শিল্পনগরীতে মাত্র ১৫৪ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই শিল্পনগরীর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে ব্যবসার প্রসার ঘটবে– এমনটাই আশা ছিল সবার। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে এ নগরী। নগরীতে মোট প্লটের এক-তৃতীয়াংশ ফরচুন গ্রুপের নামে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া শিল্পনগরীর অপর ৫৪টি প্লটের মধ্যে মাত্র ২৮টি প্লটে ১১টি শিল্প ইউনিট উৎপাদন শুরু করেছে। বাকি ২৬টি প্লট ফাঁকা। এর মধ্যে পাঁচটি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে উদ্যোক্তারা নিতে না চাওয়ায়। এ হিসাবে ৭৯টি প্লটের মধ্যে ৫১টিই ফাঁকা পড়ে আছে।
অন্য যারা আছে তাদের দু-তিনটি ছাড়া বেশির ভাগ প্লটই চলছে কোনোমতে। এদিকে বিসিকের প্লট নিয়ে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তাদের অনেকে। তাদের কার কারও আশা ছিল, বিসিকের প্লট পেলে সহজ কিস্তিতে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাবে।
জানতে চাইলে শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. আল আমিন বলেন, ‘এ এলাকা নদীমাতৃক হলেও শিল্পনগরীর সঙ্গে নদীর কোনো সংযোগ নেই। তাই ভারী শিল্পের উদ্যোক্তারা আসছেন না। এত ছোট জায়গায় শিল্পনগরী হয় না। পশ্চিম পাশের ইট ভাটার জমি অধিগ্রহণ করে সুতালরী ব্রিজ পর্যন্ত এ নগরী নেওয়া হলে বড় অনেক উদ্যোক্তা আসতে রাজি। পায়রা বন্দর চালু হলেও অনেক উদ্যোক্তা এখানে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রত্যাশা অনুসারে ছোট উদ্যোক্তাদের আনা যায়নি, এটা ঠিক। ফরচুনের প্লট বরাদ্দ বাতিলের বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছি।’
শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, ‘বিসিকে প্লট বরাদ্দ পাওয়া উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ না পাওয়ার কারণ হলো তাদের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আমরা ব্যাংকে কোনো সুপারিশপত্র দিতে পারি না।’
ফরচুনের প্লট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের বকেয়া টাকা আদায়ে অফিসে গিয়ে, ফোনে কোনোভাবেই পাচ্ছিনা। বকেয়া টাকা আদায়ে তাগাদাপত্রের পাশাপাশি ফরচুনকে চূড়ান্ত পত্র দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে আলোচনা করে প্লট বরাদ্দ বাতিল করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
তিনি বলেন, আসলে এখানে উদ্যোক্তার অভাব। এখানে উৎপাদিত পণ্য অন্য জায়গায় পাঠাতে খরচ বেশি পড়ায় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম। এ ছাড়া শিল্পকারখানা করলে এখানে শ্রমিক আনতে হয় অন্য জেলা থেকে। জেলার যারা প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, তাদের এগিয়ে আসা উচিত। নদীবেষ্টিত এ জেলায় মাছ সংরক্ষণাগার, পেয়ারা ও আমড়ার জেলি কারখানা ইত্যাদিহতে পারে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং তাদের সচেতন করে উৎপাদনমুখী শিল্পে আগ্রহ বাড়াতে প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মোমিন উদ্দিন বলেন, বিসিক এখানে ঝালকাঠির উদ্যোক্তাদের খুব একটা আগ্রহী করে তুলতে পারেনি। ফরচুনের মালিকপক্ষ একাই ২৫টি প্লট নিয়ে কিছু না করায় সেগুলো ফাঁকা। প্লটের কিস্তির টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় পরিশোধে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে একবার ফরচুন গ্রুপের সিইও পরিচয়ে মো. হাফিজ এবং আরেকবার মিজানুর রহমানের পিএস পরিচয়ে মো. মিরাজ ফোন রিসিভ করেন। মো. হাফিজ বলেন, ‘ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরীতে ফরচুন গ্রুপের প্লট আছে। স্যার মিটিংয়ে আছেন। মিটিং শেষ করে কল ব্যাক করবেন।’ কিন্তু কেউ কল ব্যাক করেননি। গতকাল বুধবার নম্বরটিতে আবারও বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও কেউ রিসিভ করেননি।




