একযোগে ৩০ ব্যাংকের কার্ড ও এটিএম সেবা ব্যাহত

দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পেমেন্ট গেটওয়ে ‘কিউক্যাশ’ এর সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে একযোগে ৩০টি ব্যাংকের কার্ড, এটিএম ও অনলাইন লেনদেন সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে টানা প্রায় ছয় দিনের জন্য এই সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখ লাখ গ্রাহক।

কিউক্যাশের মূল কােম্পানি আইটি কনসালট্যান্সের (আইটিসি) ওয়েবসাইটে যে নোটিশ প্রচার করা হয়েছে, তাতে সিস্টেম মাইগ্রেশনকে কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে নোটিশে প্রদত্ত নম্বরে যোগাযোগ করা হলে নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান– ‘এটা সিস্টেম আপগ্রেডেশন’। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংককে না জানিয়ে এবং গ্রাহকদের কোনো ধরনের আগাম নোটিশ না দিয়ে এভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন ব্যাংকের গ্রাহকরা। কিছু ব্যাংকের গ্রাহকের দাবি,  সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা পরও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্রাহকদের এ বিষয়ে নোটিশ করেনি। ব্যাংকগুলো  বলছে, কিউক্যাশের পক্ষ থেকে আগাম ঘোষণা না পাওয়ায় তারা গ্রাহকদের জানাতে পারেননি।

কিউক্যাশের সেবা গ্রহণকারী  ব্যাংকগুলো হলো– অগ্রণী, বাংলাদেশ কমার্স, কৃষি, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক, আলফালাহ, কমিউনিটি, আইসিবি ইসলামিক, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইএফআইসি, যমুনা, জনতা, মেঘনা, মার্কেন্টাইল, মিডল্যান্ড, মধুমতি, ন্যাশনাল, এনসিসি, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল, রূপালী, শাহ্জালাল ইসলামী, সীমান্ত, এসআইবিএল, সোনালী, সাউথ বাংলা, ট্রাস্ট, ইউনিয়ন, উত্তরা এবং উরি ব্যাংক।

আইটিসির নোটিশ অনুযায়ী, গত রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ নির্ধারিত রয়েছে। এই সময়সীমায় কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড, এটিএম বুথ, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) টার্মিনাল এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফার (আইবিএফটি) সেবা ব্যাহত হবে বলা হয়েছে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের সিএফও মাহফুজুর রহমান বলেন, কিউক্যাশ বা আইটিসি আমাদের না জানিয়ে হঠাৎ করে সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল অক্টোবর মাসের ২৮ তারিখের দিকে ‘ডাউনটাইম’ নেওয়ার। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হুট করে বন্ধ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নেটওয়ার্ক বন্ধ করার দিন রোববার সন্ধ্যায় আমাদের নোটিশ দিয়েছে। আমরা গ্রাহকদের নোটিশ দেওয়ার মতো এক দিন সময়ও পাইনি। এটি একটি চরম অপেশাদার কাজ হয়েছে। তারা নিজেদের সুনাম তো নষ্ট করলই, সেই সঙ্গে মেম্বার ব্যাংকগুলোর সুনামও কাস্টমারের কাছে নষ্ট করল।’
মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের প্রায় ছয় লাখ ডেবিট কার্ড দেশের ভেতরে ও বাইরে সম্পূর্ণ সচল রয়েছে। কারণ আমাদের ডেবিট কার্ড এনপিএসবি ও ভিসা নেটওয়ার্ক এবং আমাদের নিজস্ব সিস্টেমে চলে। তবে আমাদের ক্রেডিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড ও কিউক্যাশ এটিএম বুথ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, যে কোনো কারণেই হোক, এটা যে প্রযুক্তিগত সমস্যা, তা পরিষ্কার। ফলে তাৎক্ষণিক সমাধান নেই, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে– এ ধরনের কোনো মেনটেইনেন্স করার অনেক আগে থেকেই পত্রিকা, টিভি এবং গ্রাহকদের মেসেজ পাঠিয়ে আগাম বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। কারণ গ্রাহকদের এভাবে বিড়ম্বনায় ফেলার অধিকার কোনো ব্যাংকের নেই।
তিনি আরও জানান, কিউক্যাশ বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এই সিস্টেম মাইগ্রেশনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকে কিছুই জানায়নি। গ্রাহকদেরও আগাম কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। বিষয়টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে খুব শিগগির সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাইবে, কেন তারা গ্রাহকদের আগে না জানিয়ে এককভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা বন্ধ রাখল।

তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টসের (আইটিসি) পেমেন্ট গেটওয়ে কিউক্যাশ হলো ব্যাংকগুলোর কার্ডভিত্তিক লেনদেনের একটি যৌথ পেমেন্ট সুইচ ও এটিএম/পিওএস নেটওয়ার্ক। আইটিসির হেড অব প্লানিং ফাইজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আমাদের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে ২৮ অক্টোবর থেকে সেবা বন্ধ করার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ তারিখে এগিয়ে আনা হয়েছে। আগে থেকে কেন নোটিশ করা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়নি।

গ্রাহকদের ভোগান্তি
কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা না থাকায় রেস্তোরাঁয় বিল দেওয়া, কেনাকাটা করা কিংবা জরুরি ক্যাশ টাকা তোলার ক্ষেত্রে তীব্র বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেক গ্রাহক এটিএম বুথে গিয়ে হঠাৎ জানতে পারছেন যে সেবা বন্ধ। এমনকি ডিপোজিট বা মেয়াদি আমানতের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে কিনা, তাও অ্যাপের মাধ্যমে দেখতে পারছেন না অনেকে। কিউক্যাশের দেওয়া হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করেও গ্রাহকরা কোনো স্পষ্ট তথ্য বা সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর