মানসিক চাপেও বাড়তে পারে কোলেস্টেরল

0
5

কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার কথা শুনলেই অনেকে শুধু তেল-চর্বিযুক্ত খাবারকে দায়ী করেন। তবে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, অনিয়মিত খাওয়া ও শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস না থাকলে কোলেস্টেরলসহ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে শরীরে কিছু হরমোনের পরিবর্তন হয়। একই সঙ্গে অনেকের মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও বেশি ক্যালরির খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। ফলে সরাসরি ও পরোক্ষ—দুইভাবেই কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মানসিক চাপ কীভাবে কোলেস্টেরল বাড়ায়

মানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এগুলো শরীরকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে। স্বল্প সময়ের জন্য এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ থাকলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফরিদাবাদের ফোর্টিস হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. সঞ্জয় কুমারের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তিনি আরও বলেন, মানসিক চাপের সময় শরীর কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন ছাড়ে। এগুলো শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা করে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে লিভারে গ্লুকোজ, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড তৈরির পরিমাণ বাড়তে পারে।

মানসিক চাপ বদলে দেয় খাওয়ার অভ্যাসও

মানসিক চাপের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে খাবারের ওপর। দুশ্চিন্তায় অনেকেই না বুঝে বেশি খেয়ে ফেলেন। বিশেষ করে মিষ্টি, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া, চিপস, কোমল পানীয়সহ উচ্চ ক্যালরির খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। এ ধরনের খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত ক্যালরি থাকতে পারে। নিয়মিত এসব খাবার খেলে ওজন বাড়ার পাশাপাশি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, মানসিক চাপের কারণে অনেকে খাবারের সময় ঠিক রাখেন না। দিনের বেশির ভাগ সময় না খেয়ে থেকে রাতে বেশি খাওয়া, বারবার স্ন্যাকস খাওয়া বা গভীর রাতে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাসও শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

শুধু মানসিক চাপ নয়, খাবারও গুরুত্বপূর্ণ

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে। নিয়মিত অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া, বেকারি খাবার, ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি বেশি। তাই খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, ওটস, বার্লি, বাদাম, বীজ এবং মাছের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো। বিশেষ করে আঁশযুক্ত খাবার কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। চর্বিযুক্ত মাছেও উপকারী ফ্যাট থাকে, যা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খাবার বেশি রাখবেন

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনের খাবারে রাখতে পারেন—ওটস ও বার্লি, ডাল, ছোলা ও বিভিন্ন ধরনের শিম, শাকসবজি, পেয়ারা, আপেলসহ আঁশযুক্ত ফল, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ, মাছ ও পরিমিত অলিভ অয়েল বা স্বাস্থ্যকর তেল। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই কোলেস্টেরল কমে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। পুরো খাদ্যাভ্যাসটাই স্বাস্থ্যকর করতে হবে।

ঘুম কম হলেও বাড়তে পারে ঝুঁকি

মানসিক চাপের সঙ্গে ঘুমের সমস্যারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত কম ঘুম বা অনিয়মিত ঘুম শরীরের হরমোন ও বিপাক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ক্লান্তি বাড়ায় এবং ব্যায়াম বা শরীরচর্চার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করা জরুরি। রাত জেগে কাজ বা মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে তা ধীরে ধীরে কমিয়ে নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক করা ভালো।

ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ

নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরচর্চা করা যেতে পারে। ব্যায়াম শুধু কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেই নয়, মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। ফলে এটি একই সঙ্গে দুই দিকেই উপকার করতে পারে।

ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলুন

ধূমপান হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির জন্য ক্ষতিকর। একইভাবে অতিরিক্ত অ্যালকোহল ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়াতে পারে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কোলেস্টেরল বা হৃদরোগের ঝুঁকি থাকলে এসব অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি।

কী লক্ষণে সতর্ক হবেন

কোলেস্টেরল বেড়ে গেলেও অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এ কারণেই একে অনেক সময় নীরব সমস্যা বলা হয়। তবে দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, ওজন বেড়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে নিচের বিষয়গুলো থাকলে সতর্ক হওয়া দরকার—

  • নিয়মিত অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
  • ঘুমের সমস্যা
  • মানসিক চাপের কারণে বেশি খাওয়া
  • ওজন বা কোমরের মেদ বেড়ে যাওয়া
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস
  • পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস
  • পরীক্ষায় বারবার বেশি কোলেস্টেরল পাওয়া

কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো জীবনযাপনে কয়েকটি পরিবর্তন আনা। নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দুশ্চিন্তা বেশি হলে ধ্যান, নামাজ বা প্রার্থনা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পছন্দের কাজে সময় দেওয়াও উপকারী হতে পারে। তবে শুধু মানসিক চাপ কমালেই কোলেস্টেরল স্বাভাবিক হবে—এমন নয়। আবার শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেও সব ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান হবে না। বয়স, ওজন, বংশগত কারণ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও কোলেস্টেরলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

রক্ত পরীক্ষায় বারবার কোলেস্টেরল বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে এলডিএল বেশি থাকলে, পরিবারের কারও হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছায় কোলেস্টেরলের ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক রক্তের লিপিড প্রোফাইলসহ অন্যান্য পরীক্ষা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারেন।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া— স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here