কুমারখালী দোকানে সার সংকট, বাড়তি টাকা দিলে মেলে

0
4

৫ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কৃষক সামছুল আলম। তাঁর বাড়ি উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামে। এ ইউনিয়নে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারের কাছে কিছুদিন আগে যান সার কিনতে। কিন্তু ডিলারের থেকে সরকার নির্ধারিত দরে ১০ কেজির বেশি সার পাননি। বাধ্য হয়ে একই ইউনিয়নের বেলতলী এলাকার সাবডিলার আব্দুল কুদ্দুসের দোকান থেকে বাড়তি দামে সার কেনেন। সেখানে প্রতি কেজি ইউরিয়ার দাম ৩২ টাকা, ডিএপি সারের দাম ৩৭ টাকা ও টিএসপি সারের দাম ৩৮ টাকা রাখা হয়। অথচ সারগুলোর সরকারি দাম যথাক্রমে ২৭, ২১ ও ২৭ টাকা।

গত শনিবার সামছুলের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। একই দিন বড় ভালুকা গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের অপর কৃষক জনি মোল্লা বলছিলেন, ‘উপজেলা হয়ে যে সার আমাদের সোবাহান সাহেবের (ইউনিয়নের ডিলারের বাবা) কাছে আসে, সেই সার আমরা ঠিকমতো পাই না। ১৫-২০ কেজি করে সার দেয়। বস্তা ধরে নিতে হলে ৪-৫ জন করে ভাগে নিতে হয়। আমার ছয় বিঘা ভুই ধান। বলেন, আমার কি সম্ভব প্রত্যেক দিন যায়া যায়া ২০ কেজি করে সার নিয়ে আসা?’ সরকারি দামে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি কালোবাজার থেকে ইউরিয়া কিনেছেন ৩২ টাকা কেজিতে, টিএসপি ৪০ টাকায় আর ডিএপি ৩২ টাকায়।

সামছুল-জনির মতো কুমারখালীর হাজারো আমন চাষির কণ্ঠে একই হাহাকার। ডিলার সিন্ডিকেটের তৈরি কৃত্রিম সংকটে এসব কৃষকের পকেট থেকে কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গচ্চা যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য ও কৃষকদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) কুমারখালীতে প্রায় ১৬ কোটি টাকা লুটেছে সার সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১১ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কুমারখালী উপজেলায় বিসিআইসির ডিলার ১৩ জন আর বিএডিসির ডিলার ১৭ জন। তাদের অধীরে আছেন ১০৮ জন সাবডিলার।

বছরে ১৬ কোটি টাকা লুট
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরে কুমারখালীতে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে (২০২৫-২৬) সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ইউরিয়ার সারের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৮৩৮ মেট্রিকটন। এ ছাড়া টিএসপি দুই হাজার ৭৩৮ মেট্রিকটন, ডিএপি চার হাজার ৯৮৫ মেট্রিকটন ও এমওপি তিন হাজার ১৫৪ মেট্রিকটন বরাদ্দ হয়।

কৃষি কার্যালয়ের তথ্য ও কৃষকের করা অভিযোগ অনুযায়ী বাড়তি টাকার হিসাব করলে চিত্রটি ভয়াবহ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিকেজিতে ১৩ টাকা বাড়তি হিসাবে টিএসপি সার থেকেই তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকা বাড়তি নিয়েছে সিন্ডিকেট। প্রতি কেজি ১১ টাকা হিসাবে ডিএপি সার থেকে পাঁচ কোটি ৪৮ লাখ টাকা; প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা হিসাবে এমওপি সার থেকে এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং প্রতি কেজি পাঁচ টাকা হিসাবে ইউরিয়া সার বিক্রি করে পাঁচ কোটি ৪১ লাখ টাকা লুটেছে চক্র।

সারের জন্য হাহাকার
চলতি আমন মৌসুমে উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, চাঁদপুর, সদকী, শিলাইদহ ও চাপড়া ইউনিয়নের মাঠে মাঠে চলছে জমি চাষ ও চারা রোপণের কাজ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সারের চাহিদা। চাষিরা বলছেন, এই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ডিলার-সাব ডিলারদের সিন্ডিকেট।

গত এক সপ্তাহ সরেজমিন দেখা গেছে, ন্যায্যমূল্যের ডিলার পয়েন্টে গিয়ে চাহিদামতো সার মিলছে না। বাধ্য হয়ে কৃষক ছুটছেন সাবডিলারের কাছে। কেউ কালোবাজারেও ছুটছেন। সেখানে সরকার নির্ধারিত দামে কোনো সারই বিক্রি হচ্ছে না।

পান্টি ইউনিয়নের জোতভালুকা গ্রামের মোহাম্মদ শাহাদত শেখের ছেলে মজনু শেখ বলেন, ‘সরকারি দামে সার পাচ্ছি না। সাব ডিলারের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজি ইউরিয়া, ৪২ টাকা কেজি টিএসপি কিনেছি। চাষ করতি হলে সার কেনাই লাগবে। কোনো উপায় নেই।’

বাজারের চিত্রও একই। প্রতি কেজি টিএসপি ২৭ টাকার জায়গায় ৩৮-৪২ টাকা, ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩০-৩২ টাকায়, ডিএপি ২১ টাকার বদলে ৩২-৩৫ টাকায় ও এমওপি ২০ টাকার পরিবর্তে ২৫-২৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য কৃষকেরা সরাসরি ডিলারদের দায়ী করছেন। তারা বলছেন, চাহিদামতো সার না দিয়ে অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বারবার ডিলারের কাছে যেতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি বাড়তি ভোগান্তি। কম সার দেওয়ার কথা স্বীকার করেন পান্টি ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলার মেসার্স পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাবিউল্লাহ পলাশ। তাঁর ভাষ্য, কৃষকের সার ব্যবহার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য কৃষকদের বুঝাতে ও সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে কম সার দেওয়া হচ্ছে।

একই ইউনিয়নের বেলতলার সাব ডিলার আবদুল কুদ্দুসের মেসার্স ওয়াকিল এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক তাঁর ছেলে ওয়াকিল আহমেদ। তিনি বেশি দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তবে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা বেশি নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘চাহিদামতো সার কিনতে কৃষকদের অন্য এলাকার ডিলারের কাছে পাঠানো হচ্ছে। অন্য ডিলারের কৃষক আসলে বেশি টাকা নেওয়া হতেই পারে। কিন্তু তাঁর অভিযোগ আমলে নেওয়া যাবে না। কারণ, বাইরে থেকে সে কেন আসবে?’

কালোবাজারে বিক্রি
যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম। দুই বিঘা জমির জন্য গত ২ আগস্ট সার কিনতে তিনি গিয়েছিলেন ভবানীপুরের বড় ভাই মোড়ের দোকানি আবিদ হাসানের কাছে। আবিদ তাঁর কাছে প্রতিকেজি ইউরিয়ার দাম ৩২ টাকা, এমওপি প্রতিকেজি ২৫ টাকা ও ডিএপি সারের দাম প্রতিকেজি ৪৫ টাকা রাখেন। রবিউল বলেন, সরকারি দামে সার মিলছে না। অতিরিক্ত টাকা দিলেই বেশি বেশি সার পাওয়া যায়।

আবিদ হাসানের সার বিক্রির লাইসেন্স নেই। তবু বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। একইভাবে লাইসেন্স ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করছেন পান্টি ইউনিয়নের পান্টির গোদের বাজারের ব্যবসায়ী জাকির হোসেনও। জাকির এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। আবিদ হাসান দাবি করেন, ‘আমার সার বিক্রির লাইসেন্স নেই। নিজের জমির জন্যে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন এলাকার ডিলারের কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ বস্তা করে সার কিনে দোকানে রাখি। কিন্তু আমি কোনো কৃষকের কাছে বিক্রি করি না।’
চাপড়া ইউনিয়ন বোর্ড অফিস এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা মনিরুল ইসলামের দাবি অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। তিনি বলেন, সাবডিলারদের ওপর নজরদারি চালাতে হবে। কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।

আলাউদ্দিন নগর বাহার কৃষি কলেজের অধ্যক্ষ নুর-ই-আলম বলেন, আমন মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়।
কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান বলেন, সার নিয়ে কারসাজি দীর্ঘদিনের। ডিলাররা কালোবাজারে সার বিক্রি করছেন বলেই কৃষক পাচ্ছেন না। কোটি কোটি টাকা লুটছে সিন্ডিকেট।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনের ভাষ্য, কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কয়েকটি ডিলার পয়েন্টে অবস্থান করে সার দেবেন। সিন্ডিকেট ও অসাধু ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।

ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, সারের কৃত্রিম সংকট ও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ মৌখিকভাবে পেয়েছেন, লিখিত পাননি। কৃষক যেন সরকারি দামে সার পায় সেটি নিশ্চিতে কাজ করছেন। দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার  আশ্বাস দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here