বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্ত করবে না কমিশন

0
7

মানবাধিকার কমিশনের নতুন আইনের যে খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা নেই। বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন তা তদন্ত করতে পারবে না। বরং যে বাহিনী বা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের কাছেই প্রতিবেদন চাইবে। তাতে যদি কমিশন সন্তুষ্ট না হয় বা কমিশনের সুপারিশ কার্যকরের বিষয়ে না জানায়, তবেই কমিশন তদন্ত করতে পারবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬-এর খসড়ায় এসব বিধান রাখা হয়েছে। ২০০৯ সালের আইনে মানবাধিকার কমিশনের বাহিনী বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই। শুধু প্রতিবেদন চাইতে পারে। এই আইন বাতিল করে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে কমিশনকে তদন্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি পাস করায়নি। পুনর্বহাল করেছে ২০০৯ সালের আইন।

বিরোধী দলের আপত্তির মুখে গত এপ্রিলে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছিলেন, অধ্যাদেশটি বাতিল করলেও সরকার যুগোপযোগী মানবাধিকার কমিশন আইন করবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ে বিএনপি সরকারের গঠিত কমিটি আপত্তি তুলেছিল মানবাধিকার কমিশনের গঠন পদ্ধতি ও তদন্ত ক্ষমতা নিয়ে। সংস্থাটিতে চেয়ারম্যান, কমিশনার নিয়োগে বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধি কম থাকা, কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থাকায় আপত্তি করা হয়। নতুন আইনের খসড়ায় নিয়োগ কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সংসদে পাস হলে তা আইনে পরিণত হবে।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস সমকালকে বলেন, খসড়াটি আইনে পরিণত হলে মানবাধিকার কমিশন একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। শুরুতেই স্বাধীন তদন্তের পথ বন্ধ করায় অভিযুক্ত বাহিনী প্রতিবেদনে সত্য নাকি মিথ্যা বলছে– কমিশনের হাতে এমন কোনো তদন্তলব্ধ তথ্য-প্রমাণ থাকবে না, যার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা যাবে। আর চিঠি চালাচালি করতে করতেই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি লোপাট হবে।

নিয়োগে সরকারের ভূমিকা বাড়ছে
বিদ্যমান আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, বাছাই কমিটির সুপারিশে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেবেন। ৭ ধারায় বলা হয়েছে, সংসদের স্পিকারের সভাপতিত্বে বাছাই কমিটির সদস্য হবেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্পিকারের মনোনীত সরকারি এবং বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য (এমপি)। এ কমিটিতে বিরোধী দলের একজন এমপি বাদে সবাই সরকারের প্রতিনিধি।

২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বিধান করা হয়, প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক হবেন বাছাই কমিটির সভাপতি। সদস্য হবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি ও বিরোধী দল মনোনীত একজন করে এমপি, মানবাধিকার বিষয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অধ্যাপক, রাষ্ট্রপতি মনোনীত মানবাধিকার সংরক্ষণ বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাগরিক প্রতিনিধি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা তাঁর মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত একজন প্রতিনিধি। তাদের সুপারিশে চেয়ারপারসন ও চার কমিশনার নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।

অধ্যাদেশের মতো কমিশনের পদকে চেয়ারপারসন এবং কমিশনার নাম দেওয়া হলেও নতুন আইনের খসড়ায় স্পিকারের সভাপতিত্বে বাছাই কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। সদস্য হবেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি ও বিরোধী দল মনোনীত একজন করে এমপি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত একজন অধ্যাপক, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রপতি মনোনীত একজন নাগরিক প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি।

মন্ত্রীদের অন্তর্ভুক্তির ফলে সরকারের প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে বাছাই কমিটিতে। ৯ সদস্যের কমিটির পাঁচজন সরাসরি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ফলে সরকারের পছন্দের বাইরে কারও চেয়ারপারসন, কমিশনার নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

নতুন আইনের খসড়ায় সাক্ষাৎকারের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। চেয়ারপারসন বা কমিশনারের প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজন প্রার্থীর নামসহ একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এসব নিয়োগ দেবেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। একই পদে একাধিক নাম পাঠানোর কারণে সরকারের পছন্দের সুযোগ থাকছে।

অজুহাত দেখানোর সুযোগ 
বিদ্যমান আইনে বলা নেই, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কেউ মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কী হবে। অধ্যাদেশে বিধান ছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘনে কোনো অজুহাত দিয়ে রেহাই পাওয়া যাবে না। ল্যাপস (অকার্যকর) হওয়া অধ্যাদেশের ১৫ ধারায় বলা হয়েছিল, সংবিধান বা বলবৎ কোনো আইনে স্পষ্টভাবে সমর্থিত না হলে, কেবল সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশে করা হয়েছে– এমন অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।

নতুন আইনের খসড়ায় এই বিধান নেই। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকার উল্টো যাত্রা করছে। কারণ, সরকারি বাহিনীগুলোর সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ওপর মহলের আদেশের কথা বলে। এর মাধ্যমে রেহাই পায়। আবারও সেই সুযোগ রাখা হচ্ছে।

‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে অনুমতি লাগবে
অধ্যাদেশে কমিশনকে কারাগার ও হাজতখানাসহ যে কোনো আটককেন্দ্র, নিরাপত্তা হেফাজত, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কিংবা চিকিৎসা বা যেখানে মানুষকে অন্তরীণ রাখা হয়, তা পরিদর্শন এবং অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারকে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু খসড়া আইনের ১৩ ধরায় বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তকালীন বা পরবর্তী সময়ে যে কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে যে কোনো স্থান, অফিস-আদালত, হাজতখানা বা আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবে কমিশন।

শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন বাহিনী আয়নাঘরখ্যাত গোপন বন্দিশালা পরিচালনা করে। যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটক রাখা হতো। আইনের খসড়া অনুযায়ী এমন বন্দিশালা পরিদর্শনে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। যদিও অতীতে কর্তৃপক্ষ কখনোই এমন বন্দিশালার অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত নয়
২০০৯ আইনের সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা না থাকা। বিদ্যমান এ আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনীর বা এর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে, সরকার তা দেবে। প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট না হলে করণীয় সম্পর্কে সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারে। সুপারিশ পাওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে সরকার গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে কমিশনকে জানাবে।

২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের তিন মাসের প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

তবে কমিশনের ক্ষমতা অধ্যাদেশের তুলনায় একেবাবেই কমে যাচ্ছে খসড়া আইনের ১৯ ধারায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের অনুসন্ধানে গঠিত কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নাবিলা ইদ্রিস বলেন, মানবাধিকার কমিশন দেশজুড়ে নিজস্ব তদন্ত কর্মকর্তা ও দল দিয়ে তদন্ত করতে পারলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না। উল্টো কমিশনকে অভিযুক্ত বাহিনীর কাছ প্রতিবেদন চাইতে হবে। মানে, বাহিনী নিজেই নিজেকে তদন্ত করবে। এতে কমিশন সন্তুষ্ট না হলে করণীয় সুপারিশ করবে। কিন্তু খসড়ায় বলা হয়নি, বাহিনী কত দিনের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন দেবে। এতে ফাঁক রাখা হয়েছে। চাইলে তো বাহিনী অনন্তকাল সময় নিতে পারবে বা বিলম্ব করতে পারবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here