সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডে মৃত্যু টানাটানির দুই সংসারে দুই সন্তান হারানোর শোক

২০১৮ সালে এসএসসি পাস করেছিলেন মোহাম্মদ খোকন মিয়া। কাজের সন্ধানে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বাড়ি ছেড়ে সে বছরই ঢাকায় যান। কয়েক বছর কাজ করেন পোশাক তৈরির কারখানায়। ২০২৫ সালে তিনি যোগ দেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে অবস্থিত ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে। এক বছরের মাথায় গত শুক্রবার স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে অন্য আটজনের সঙ্গে প্রাণ গেছে তাঁর।

গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামে আনা হয় খোকনের (২৬) মরদেহ। এ সময় স্বজনের কান্নায় দেখা দেয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন হয় খোকনের। তিনি ওই গ্রামের মো. রানা মিয়ার ছেলে।
এক বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খোকন সবার ছোট। খোকনের আয়েই টানাটানি করে চলত সংসার। তিন বছর আগে পাশের গ্রামের শাপলা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে জিসানের বয়স সবে দেড় বছর।

মো. রানা মিয়া বলেন, ‘ছেলের বেতনে সংসার চলত। মালিক আমার সেই ছেলেটিকে কেড়ে নিল। এখন আমার দেড় বছর বয়সী নাতি জিসানের দায়িত্ব নিবে কে? অল্প বয়সে আমার নাতি বাবাহারা হয়ে গেল। তাকে নিয়ে কোথায় যাব?’
স্বামীর সঙ্গে কিছু বিরোধের কারণে সাত-আট মাস ধরে বাবার বাড়িতেই আছেন শাপলা বেগম। মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন শ্বশুরবাড়ি। শিশু জিসানের ভরণপোষণের জন্য কোম্পানি ও সরকারের সহায়তা চান শাপলা ও তাঁর শ্বশুর।

ধোপাডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোকলেছুর রহমান মণ্ডলের ভাষ্য, অকালে ছেলেটিকে হারিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেল। তাঁর শিশুসন্তান ও পরিবারের সহায়তা দরকার। ইউএনও ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, তাঁর নজরে এসেছে এই দুর্ঘটনার তথ্য। তিনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন।

‘ব্যাটাক কারখানাত মারি ফেলালো’
‘বড় ছেলে বিয়ে করি আলাদা খায়। সংসার চালাতো ছোট ছেলে রানা। সেই ব্যাটাক ওমরা (ওরা) কারখানাত নিয়ে যায়া মারি ফেলালো।’ এমন আর্তনাদ করছিলেন মনোয়ারা বেগম। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩) মারা গেছেন একই দুর্ঘটনায়। গতকাল গাইবান্ধা সদরের কুপতলা ইউনিয়নের গোডাউন বাজারসংলগ্ন উত্তরপাড়া গ্রামে দেখা যায় তাঁর স্বজনের আহাজারির দৃশ্য।
গতকাল সকাল ৯টায় রানার লাশ পৌঁছায় বাড়িতে। জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। বাড়িতে  মা মনোয়ারা বেগম কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘কয়েকদিন আগেই বাড়িত আসছিল। মোর বাওয়ার (ছেলে) সাথে আর দেখা হবে না। হামরা এখন কিভাবে বাঁচি থাকমু?’

উত্তরপাড়ার হারুন মিয়ার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সবার ছোট রানা। পেশায় কৃষক হারুন মিয়া অনটনের মধ্যেও তিন সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বড় ছেলে মোনারুল চট্টগ্রামে আবুল খায়ের স্টিল মিলে কর্মরত। রানাও সেখানে কাজ করতেন। কারখানা বন্ধ হওয়ায় সম্প্রতি ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজ নেন।

রানার সঙ্গে একই সঙ্গে পড়াশোনা করতেন প্রতিবেশী তয়ন ইসলাম। তয়নের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালে রানা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে সাদুল্লাপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার জন্য কিছুদিন আগেই বাড়িতে এসেছিলেন রানা। ‘এভাবে সে মারা যাবে, ভাবতেও পারছি না’ বলে চুপ করে যান তয়ন। প্রিয় বন্ধু হারানোর শোক তাঁকে যেন চেপে ধরেছে।
উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকার দেখছেন হারুন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে বড় ছেলের বিয়ে হয়েছে। অভাবের কারণে পড়ালেখা শেষ করার আগেই সংসারের হাল ধরতে চট্টগ্রামে চাকরি নেয় রানা। সেই সংসার চালাতো। আমি গরিব মানুষ, জমিজমা নাই। রানার মৃত্যুতে আমি একেবারে শেষ। সংসারের হাল ধরার মতো আর কেউ থাকল না।’

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর