ডারউইনে ইতিহাসের হাতছানি

মেহেদী হাসান মিরাজের একটি বাক্য মনে গেঁথে নেওয়ার মতো। ডারউইন টেস্ট জয়ের ব্যাপারে ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে দেখি এই কন্ডিশনে জিততে পারি কিনা। বিশ্বাস ছিল বলে না; নিউজিল্যান্ডে জিতেছিলাম।’ সিরিজের প্রথম টেস্টে টানা তিন দিন দাপুটে ক্রিকেট খেলেছে বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার ম্যাচের তৃতীয় দিনের শেষ সেশনটা বাদ দিলে স্বপ্নের মতো ছিল সবকিছু।

অনেক দিন দেখা হয়নি এমন নিখুঁত ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং। যে মেহেদী হাসান মিরাজের পারফরম্যান্স নিয়ে ছিল ফিসফাস, তিনিই পারফরম্যান্সের বিবর্তন ঘটিয়েছেন ডারউইনে। তিনি দারুণ ব্যাটিং করেছেন টেলএন্ডারদের নিয়ে। ১৫৪ বলে খেলেছেন ৬৫ রানের মহামূল্যবান ইনিংস। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করতে পেরেছে বাংলাদেশ। ২২৮ রানের লিড পাওয়ায় উঁকি দিচ্ছে জয়ের স্বপ্ন। তাই তো অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে চার উইকেট তুলে নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তরা কোরাস গাইছেন– ‘স্বপ্ন-স্বপ্ন-স্বপ্ন দেখে মন’। এই স্বপ্ন ইতিহাস গড়ার। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে মুমিনুল হকরা যেমন করে স্বপ্ন সত্যি করেছিলেন।

ডারউইন টেস্টে দ্বিতীয় দিন থেকেই জয়ের সুবাস পাচ্ছে বাংলাদেশ। তৃতীয় দিনের খেলা শেষে মিলছে ইতিহাসের হাতছানি। প্রথমবার টেস্ট জয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। তিন বিভাগে অপ্রত্যাশিত ভালো ক্রিকেট খেলায় আশার পালে হাওয়া লাগে। বিদেশের মাটিতে ৭৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৯টিতে জিতেছে বাংলাদেশ। ওই জয়ের ম্যাচগুলোতেও ছিল উত্থান-পতন। কলম্বো, মাউন্ট মঙ্গানুই, রাওয়ালপিন্ডিতে লড়াই হয়েছে সমানতালে। সেখানে ডারউইন টেস্টের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের দাপটের সামনে অস্ট্রেলিয়াকে দেখাচ্ছে মিনোস। ম্যাচে টানা তিন দিন এগিয়ে থেকে শেষ করেছে টাইগার বাহিনী। কিছুতেই এই পারফরম্যান্স মেনে নিতে পারছে না উন্নাসিক অস্ট্রেলিয়ানরা। রিকি পন্টিং ধারাভাষ্যে বলেছেন, ‘বুড়োদের দল নিয়ে খেলছে অস্ট্রেলিয়া।’ স্কোয়াড পরিবর্তনের ডাক দেন তিনি। আসলে পন্টিং অস্ট্রেলিয়ার দুর্বলতা খোঁজার চেয়ে বাংলাদেশের ভালো খেলার প্রতি সম্মান দেখাতে কষ্টটা কম হতো তাঁর।

বাংলাদেশ দ্বিতীয় দিন শেষ করেছিল ৬ উইকেটে ৩৫১ রানে। মেহেদী মিরাজ ৩২ আর হাসান মাহমুদ ১৩ রানে অপরাজিত থাকলেও গতকাল ইনিংস বড় করতে পারেননি। এক রান যোগ করে জশ হ্যাজেলউডের বলে এলবিডব্লিউ হন হাসান। ১৭০ বলে ৪৬ রানের জুটি তাদের। মিরাজের সঙ্গে হাসানের বোঝাপড়া ছিল দারুণ। ৯২টি বল মোকাবিলা করে ১৪ রান করেন তিনি। দিনের শুরুতে উইকেট হারালেও হার মানেননি মিরাজ। টেলএন্ডারদের নিয়ে ছোট ছোট জুটিতে বড় করেন ইনিংস। তাইজুল ইসলামের ২৩ বলে ৭ রানের ক্যামিও, তাসকিনের টিকে থাকার দৃঢ়তা সাহস জুগিয়েছে মিরাজকে। তিনি আগের দিনের ৩২ রানের সঙ্গে যোগ করেন ৩৩ রান।

তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রান ছাপিয়ে ৬৫ রানের মিরাজই হয়ে ওঠেন ব্যাটিংয়ের নায়ক। এই রান করা কতটা কঠিন ছিল– সংবাদ সম্মেলনে তা প্রকাশ করেছেন টাইগার অলরাউন্ডার। শেষ জুটিতে তাসকিন-এবাদত মিলেও জোগান দেন মূল্যবান ৮টি রান। বাংলাদেশের নজরকাড়া দিনে অসি পেসার হ্যাজেলউডের একটি দারুণ অর্জন আছে। ১৩ মাস পর টেস্ট খেলতে নেমে ইনিংসে ৬ উইকেট শিকার তাঁর। টেস্টে ১৪তম বার ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেলেন তিনি। পাঁচ উইকেট নেওয়ার পরই মাইলফলক ছুঁয়েছেন হ্যাজেলউড। অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হিসেবে ৩০০ টেস্ট উইকেটের মালিক হন তিনি।

অস্ট্রেলিয়া ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে হোঁচট খায় শুরুতে। পেসার হাসান বল হাতে নিয়েই ব্রেক থ্রু দেন ওপেনিং জুটি ভেঙে। জ্যাক ওয়েদারাল্ডকে বোল্ডআউট করেন শূন্য রানে। অফ-সাইডের বাইরের বলে খেলতে গেলে ব্যাটের কানায় লেগে স্টাম্পে আঘাত করে। একদশ ওভারে বোল্ড করেন আরেক ওপেনার ট্রাভিস হেডকে। ৩৭ রানে দুই উইকেট হারিয়ে চিন্তায় পড়ে স্বাগতিকরা। মার্নাস লাবুশেন ও স্টিভেন স্মিথ ইনিংস মেরামত করে কিছু পথ এগিয়ে নেন। ৩৬ রানের জুটি করেন দুজনে। স্মিথ ও গ্রিনের জুটি ৪৯ রানের।

তাইজুল আর মিরাজ গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যাটারকে ফিরিয়ে তৃতীয় দিনটিও নিজেদের করে নেন। সবচেয়ে দামি স্মিথের উইকেটটি নিয়েছেন মিরাজ। লাবুশেন ৩১ আর স্মিথ ৪৪ রান করেছেন। ক্যারি ও গ্রিন জুটি ৩৯ রানে অপরাজিত। গ্রিন ৪৩ আর ক্যারি ১৯ রানে নতুন করে জুটি বাঁধবেন চতুর্থ দিন। এই জুটির ওপরই ভরসা স্বাগতিকদের। তেমনি তাদের আউট করাও সফরকারীদের লক্ষ্য। তৃতীয় দিনের সেরা মিরাজের মতে, ম্যাচ জয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ আজকের প্রথম সেশন। কারণ, ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় এড়াতে অস্ট্রেলিয়াকে আরও ৬৭ রান করতে হবে। কে জানে, মিরাজরা হয়তো ইনিংস ব্যবধানে ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর