নিয়োগ বিধিমালায় পরীক্ষার পদ্ধতি ও ধরন স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এর পরও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ৯টি পদে ১৯৭ জনকে নিয়োগ দিতে তড়িঘড়ি চলছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় সর্বনিম্ন পাস নম্বর কত, তাও প্রকাশ করা হয়নি। এতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ৭০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। এক হাজার ৮৪২ প্রার্থীর পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশ করা হয়। নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য এত অল্প সময়ে কীভাবে বিপুলসংখ্যক খাতা মূল্যায়ন করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংশ্লিষ্টরা। এর পর ৪ আগস্ট ইঞ্জিন ড্রাইভার ও নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট এবং ৬ আগস্ট ড্রাইভার পদে ৩০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার নাম, বিষয়, নম্বর, সময় ও সর্বনিম্ন পাস নম্বর পরীক্ষার আগেই প্রকাশ করতে হয়।
ফায়ার ফাইটার পদেও একইভাবে দ্রুততার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। আজ সোমবার মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই ২০৬ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগের ফল প্রকাশ করা হতে পারে। অথচ চলমান এই নিয়োগকে ঘিরে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মীকে অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে একটি প্রতারক চক্র প্রার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থায় দ্রুততার সঙ্গে নিয়োগ সম্পন্ন করার যৌক্তিকতা থাকলেও বিধিমালা পাশ কাটিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৯৯৯ সালের নিয়োগ বিধিমালা কয়েক দফা সংশোধন হলেও পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সেখানে যুক্ত করা হয়নি।
এমসিকিউ কি লিখিত পরীক্ষার বিকল্প
নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিতর্কের বড় জায়গা পরীক্ষার ধরন। ফায়ার সার্ভিসের স্থায়ী রাজস্ব খাতের শূন্য পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে এমসিকিউ (বহু নির্বাচনী প্রশ্ন) পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া যাবে কিনা, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জবাবে জনপ্রশাসন জানায়, এমসিকিউ কেবল প্রাথমিক বাছাইয়ের মাধ্যম; এটি লিখিত পরীক্ষার বিকল্প নয়। কোনো পদে আবেদনকারীর সংখ্যা এক হাজার এক বা তার বেশি হলে প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। অথচ ফায়ার সার্ভিসের চলমান নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা এমসিকিউর আদলে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এটি প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষা, নাকি বিধি অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষা?
বিভাগীয় নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষাটি এমসিকিউর মতোই নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করতে পেরেছি।’
তবে নিয়োগ কমিটির সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ওয়ালীউল হাসান বলেন, ‘মনে হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা গ্রহণ করছে। তবে এর আইনি ব্যাখ্যা নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবই দিতে পারবেন।’
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য
নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক মো. শহীদ আতাহার হোসেন বলেন, অতীতে ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ নিয়ে অনেক বদনাম ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। বিধি সংশোধন করে পরীক্ষা নিতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগবে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অগ্নি অনুবিভাগ) মোহাম্মাদ মফিজুর রহমান বলেন, যেভাবে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হবে, সেটা নিয়োগ বিধিতে বলা থাকতে হবে। সে অনুযায়ী পরীক্ষা হবে। এখানে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি দেওয়ার কিছু নেই।
পাঁচ ঘণ্টায় ১,৮৪২ খাতা মূল্যায়ন!
গত ২৪ জুলাই এক হাজার ৮৪২ প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশ করা হয়। পাঁচ সদস্যের নিয়োগ কমিটি কীভাবে এত কম সময়ে সব উত্তরপত্র মূল্যায়ন করল– এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে পরীক্ষার্থীদেরও জানানো হয়নি কে কত নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, বিধিমালা সংশোধন না করে অন্যভাবে পরীক্ষা নিলে তা নিয়োগ বিধির পরিপন্থি হবে। কেউ আদালতের শরণাপন্ন হলে নিয়োগ বাতিল হতে পারে। তিনি বলেন, স্বচ্ছতার দোহাই দিয়ে বিধি ভঙ্গের সুযোগ নেই।
২৫ হাজার প্রার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় মাত্র ৭,৯৯৭
এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ফায়ার সার্ভিসের শারীরিক যোগ্যতার পরীক্ষা হয়। এ কারণে ২৫ হাজার আবেদনকারীর বিপরীতে প্রায় ১৭ হাজার প্রার্থী বাছাই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষায় ফায়ার ফাইটার পদে এক হাজার ৬৯৮, নার্সিং অ্যাটেনডেন্টে সাত, ড্রাইভার পদে ১৩১ এবং ইঞ্জিন ড্রাইভার পদে ছয়জন উত্তীর্ণ হন। পরে লিখিত পরীক্ষায় ফায়ার ফাইটার পদে ৪১৫, নার্সিং অ্যাটেনডেন্টে তিন, ড্রাইভার পদে ৭৬ এবং ইঞ্জিন ড্রাইভার পদে চারজন উত্তীর্ণ হন। এর পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট পদে দুজন, ড্রাইভার পদে ২২ এবং ইঞ্জিন ড্রাইভার পদে একজনকে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির পরও পাঁচ পদে পরীক্ষা হয়নি
শুধু পরীক্ষা ও দ্রুত ফল প্রকাশ নয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালায় সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং অফিস সহায়ক পদ নেই। ফলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও এসব পদে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ধর্মীয় শিক্ষক (ইসলাম) ও সহকারী হোজ রিপেয়ারার পদেও বিজ্ঞপ্তির পরও পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিধিমালা সংশোধন না করেই বিভিন্ন সময় নিয়োগ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এবারও একই ধরনের অস্পষ্টতা রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করায় শেষ পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির বৈধতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়ছে
নিয়োগের অনিশ্চয়তার মধ্যে বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় প্রতারক চক্র পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক শহীদ আতাহার হোসেনও প্রতারক চক্রের তৎপরতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিয়োগ-সংক্রান্ত একটি প্রতারক চক্র আছে। এ জন্য আমরা কঠোর নজরদারির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’


