স্বাস্থ্য খাতে ১৮০ দিনে এক-তৃতীয়াংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে

স্বাস্থ্য খাত আধুনিকায়ন ও সেবার মান বাড়াতে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় ১২টি প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মধ্যে চারটিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার চূড়ান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত অগ্রগতির প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন, সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অবকাঠামো সংস্কারে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে ই-হেলথ কার্ড, ই-প্রেসক্রিপশন, জনবল নিয়োগ ও পদমর্যাদা উন্নীত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে প্রশাসনিক জট রয়ে গেছে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় অনুমোদন, পদ সৃজন ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় এগুলো নির্ধারিত সময়ে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এরই মধ্যে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বাড়তি সময় ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কিছু উদ্যোগে গতি কমেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ও স্পষ্ট রোডম্যাপ, যার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হলো স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের নিচে থাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন-২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

এ ছাড়া চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের সব সরকারি হাসপাতালে আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। অবকাঠামো সংস্কারেও অগ্রগতি স্পষ্ট। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে সারাদেশে এক হাজার ৯৬৩টি অবকাঠামো মেরামতে ১৯০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হচ্ছে। এসব কাজের ভৌত অগ্রগতি শতভাগ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি হয়েছে। ১৫টি হাসপাতালে আন্তর্জাতিক মানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যের বিপরীতে ভৌত অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। তবে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৪৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ, অবকাঠামোগত কাজ এগোলেও অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান রয়েছে। মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো সংক্রান্ত প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৩০ দশমিক ২৫ শতাংশ।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে এই প্রতিবেদন মূলত দীর্ঘ স্থবিরতার চিত্র। দৃশ্যমান উন্নতি বা অবনতি কোনোটিই হয়নি, খাতটি আগের জায়গাতেই রয়েছে। তাঁর মতে, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে দেশের ব্যর্থতাই সবচেয়ে বড় বিষয়।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে পুরো স্বাস্থ্য খাতের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে কিছু রাজনৈতিক ঘোষণার অসামঞ্জস্য বাদ দিলে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, গত ৫৫ বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র দশমিক ৭ শতাংশে আটকে ছিল। এবার তা বাড়িয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তা ৫ শতাংশে নেওয়ার উদ্যোগ বড় নীতিগত পদক্ষেপ।

ই-হেলথ কার্ডে ধীরগতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ই-হেলথ কার্ড। ১৮০ দিনের মধ্যে পাঁচটি জেলায় এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য থাকলেও তা এখনও শুরু হয়নি। কারিগরি সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব (টিএপিপি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে উদ্যোগটি এখনও প্রক্রিয়াধীন। জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন ও অটোমেশন কার্যক্রমে অগ্রগতি প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) সঙ্গে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে।

আজিমপুর প্রকল্পে অগ্রগতি সামান্য 
প্রতিবেদনে বলা হয়, আজিমপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডরমিটরি ও হোস্টেল নির্মাণ প্রকল্পে অগ্রগতি মাত্র ১.১ শতাংশ। ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। এ ছাড়া নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তার একটি প্রকল্প গত ২৬ এপ্রিল একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। কড়াইলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতেও সমীক্ষা ও বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

নিয়োগে সুপারিশ, আটকে ভেরিফিকেশনে
স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট কাটাতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে ৪০১ জন নিয়োগের লক্ষ্য থাকলেও ৫৯৮ জনের সুপারিশ পাওয়া গেছে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছে। ফলে বেশি প্রার্থীর সুপারিশ এলেও মাঠ পর্যায়ে নতুন জনবল যোগ দিতে সময় লাগবে।

পদ সৃজনে প্রশাসনিক জট
বিদ্যমান জনবলের পদমর্যাদা উন্নীত করার উদ্যোগে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নার্সিং সুপারভাইজারদের এক হাজার ২০৮টি পদ নবম গ্রেডে এবং অন্য পদগুলো পঞ্চম ও সপ্তম গ্রেডে উন্নীত করতে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অংশ হিসেবে ১৫ হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং দুই হাজার ৪৭০টি মিডওয়াইফ পদ সৃজনের প্রস্তাবও জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এগুলো এখনও অনুমোদন পায়নি। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পদ সৃজন ও পদমর্যাদা উন্নীত করার বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংস্কারে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বড় বাধা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, জনবল বৃদ্ধি ও সংস্কারে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বড় বাধা। আগামী পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এসব জট দ্রুত কাটানোই মূল চ্যালেঞ্জ।

জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজীর আহমেদ সমকালকে বলেন, বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ও স্পষ্ট রোডম্যাপ, যার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো এখনও অনেকটাই আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি স্পষ্ট নয়। শুধু শয্যা বাড়ালেই সেবার মান বাড়ে না; জনবল, বাজেট, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা বললেন
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এর মধ্যে জরুরি পরিস্থিতিতে হামের টিকার মজুত নিশ্চিত করা এবং টিকাদান জোরদার করা অন্যতম। তিনি জানান, টিকার সংকট কাটিয়ে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের ২৯৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫১ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার, শিশুদের জন্য ২৫ শয্যার চাইল্ড কেয়ার সেন্টার ও জরুরি পরিস্থিতির জন্য ১৫টি শয্যা থাকবে। এ জন্য হাসপাতাল ভবনের পরিসরও বাড়ানো হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর