বেসরকারি খাতে বিদেশি উৎসের ঋণেও ধীরগতি

বেসরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ উৎসে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ। বিদেশ থেকে যে পরিমাণ ঋণ আসছে পরিশোধ হচ্ছে তার বেশি।
আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়া, রপ্তানি কমে যাওয়া, টাকার দরপতন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমাসহ বিভিন্ন কারণে ঋণের চাহিদা কমে গেছে; যার প্রভাবে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে প্রথমবারের মতো গত জুনে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। দেশি উৎসের পাশাপাশি বিদেশি উৎসের ঋণেও একই পরিস্থিতি।

মূলধনি পণ্য ও শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেন ব্যবসায়ীরা। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ সেভাবে বাড়ছে না। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ডলার দরে অস্থিরতা ছিল। এখন দুটি ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বিদ্যুৎ-গ্যাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। এসব কারণে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানিতে ধীরগতি রয়েছে। সুদসহ ঋণস্থিতি দীর্ঘদিন একই রকম কিংবা আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি সামান্য কমে এক হাজার ২৫ কোটি ডলারে নেমেছে। গত এপ্রিলে যা ছিল এক হাজার ৩৩ কোটি ডলারে। চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ছিল এক হাজার ৪৭ কোটি ডলার।

স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ বেশি আসে করোনা-পরবর্তী ডলার সংকট শুরুর পর। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৫৪৬ কোটি ডলারে ওঠে। পরের বছর আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলারে। তবে পরে ডলারের দরে ব্যাপক ওঠানামার পর ব্যবসায়ীরা আবার ঋণ কমাতে শুরু করেন। ২০২৩ সাল শেষে এ ঋণ কমে এক হাজার ১৭৯ কোটি ডলারে নেমে যায়। ২০২৪ সাল শেষে আরও কমে নেমে আসে এক হাজার ১৩ কোটি ডলারে।

বিশিষ্ট ব্যাংকার ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বিপরীতে কাঁচামাল, মূলধনি পণ্যে আমদানির জন্য এ ধরনের সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিট নেন ব্যবসায়ীরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে খুব গতি না থাকায় হয়তো এ ধরনের ঋণ কমছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে আবার দেখা যাবে মূলধন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল আমদানি বেড়ে সামগ্রিকভাবে ঋণের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বন্ধ কারখানা সচলসহ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে কম সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, পেট্রোবাংলা, রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের মতো সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানও স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে থাকে। তবে সেই তথ্য এখানে যুক্ত করা হয় না। স্বল্পমেয়াদি ঋণের বাইরে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন খাতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে কারখানা পরিধি বাড়ানোর জন্যও উদ্যোক্তারা সেভাবে ঋণ নিচ্ছেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এখন এ ধরনের ঋণে কিছুটা নিরুৎসাহিত করছে। সব মিলিয়ে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ বাড়ছে না। স্বল্পমেয়াদি ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার কী হবে তা ঠিক করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মে মাসে সর্বোচ্চ সুদহারের সীমা কমানো হয়। সব ধরনের খরচসহ এখন সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ যোগ করে এ ধরনের ঋণ নিতে পারেন ব্যবসায়ীরা। আগে এসওএফআরের সঙ্গে যোগ করা যেত ৪ শতাংশ।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে গত মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ঋণস্থিতি কমে ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারে নেমেছে। তিন মাস আগে গত ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১১ হাজার ৩৫ কোটি ডলার। গত মার্চ পর্যন্ত এই বিদেশি ঋণের মধ্যে সরকারি খাতের ৯ হাজার ৯১ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে যা ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার ছিল। বেসরকারি খাতে গত ডিসেম্বরের ২ হাজার ৬ কোটি থেকে কমে ২ হাজার ২ কোটি ডলারে নেমেছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর