ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে আনার তাগিদ এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পাইলট কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোর ওপর জোর দেন কোনো কোনো সদস্য। বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, কার্ড তৈরি, অর্থ বিতরণ, জনবল, যানবাহনসহ পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর তারা গুরুত্ব দেন।
ফ্যামিলি কার্ড বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল। এর আওতায় পরিবারের প্রধান নারী ব্যক্তির হাতে সরকার প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। চার বছরে দুই কোটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাইলট কর্মসূচির পর গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে। গতকাল সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই কমিটি বৈঠকে বসে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে পাইলট পর্যায়ে পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ৪০ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে পাইলট কর্মসূচিতে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীদের ভাতা দেওয়া হয়। বাকি প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ হয় তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, কার্ড তৈরি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে। জাতীয় পর্যায়ে দুই কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে পরিচালন ব্যয় কমানোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গতকালের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
সমন্বিত তথ্যভান্ডারের ওপর গুরুত্ব
বৈঠকে জানানো হয়, ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে একাধিক সংস্থার পৃথক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের পরিবর্তে সমন্বিত তথ্যভান্ডার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারভিত্তিক তথ্য এবং বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্য সমন্বয় করা গেলে একই পরিবারকে বারবার জরিপ করার প্রয়োজন কমবে। এতে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।
বৈঠকে কার্ড ব্যবস্থাপনাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। কেউ কেউ বলেন, প্রতিটি কর্মসূচির জন্য নতুন করে কার্ড তৈরি না করে একটি কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে ভবিষ্যতে কার্ড তৈরি, বিতরণ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ বিতরণে মধ্যবর্তী ধাপ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে অর্থ পাঠানো হলে অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত থাকায় নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সহজ হবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই কোটি পরিবারকে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হলে শুধু নগদ সহায়তা বাবদ বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ফলে কর্মসূচির পরিধি বাড়ার সঙ্গে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে ভুল, একই পরিবারকে একাধিক সুবিধা দেওয়া কিংবা অযোগ্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো ঘটনা ঘটলে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ফ্যামিলি কার্ডকে দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করতে হলে প্রশাসনিক ব্যয়ের চেয়ে সুবিধাভোগীর হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর অংশ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত নিরীক্ষা, স্বচ্ছ হিসাব ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কর্মসূচিতে অপচয় কমিয়ে এর মূল লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।


