নদী-সাগরে ইলিশের আকাল শূন্য হাতে ফিরছেন জেলে

ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার সামরাজ ঘাটের মাঝি দেলোয়ার হোসেন গত বছর ছয় লাখ টাকা দাদন নিয়ে একটি ট্রলার সাগরে নামিয়েছিলেন। আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় দাদনের টাকা শোধ করতে পারেননি। প্রতি ট্রিপেই লোকসান যোগ হওয়ায় দাদনের পরিমাণ বেড়ে ৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। এ বছরও তিন লাখ টাকা দাদন নিয়ে একটি ট্রলার সাগরে নামিয়েছেন। এবারও ইলিশের আকাল যাচ্ছে। আবারও ভারী হচ্ছে দাদনের বোঝা। সুদিন ফেরার আশা নিয়ে প্রতি মৌসুম শুরু হলেও সুদিন আর আসেনি। শুধু দেলোয়ার নন, একই অবস্থা দক্ষিণ উপকূলের লক্ষাধিক জেলের।

নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক আশা নিয়ে জেলেরা নদী ও সাগরে ইলিশ শিকারে যান। কিন্তু তাদের ফিরতে হচ্ছে অনেকটা শূন্য হাতে। জালে উঠছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ। সারাদিন জাল ফেলে দু-চারটি ইলিশ পড়লেও সেগুলো ডিমওয়ালা হওয়ায় ধরা যায় না। ফলে সংসারই ঠিকমতো চলে না। দাদনের টাকাও শোধ হয় না। এভাবে দিনের পর দিন লোকসান হওয়ায় মহাজনের জালে আটকে যাচ্ছেন জেলেরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই এলাকার জেলেরা প্রায় ৫০০ কোটি টাকার দাদনের জালে আটকে পড়েছেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চরফ্যাসনের উপকূলীয় জেলেপল্লিতে লক্ষাধিক ইলিশ শিকারি রয়েছেন।
তবে বেসরকারি হিসাবে ইলিশ শিকারির সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি।

ঢালচর ঘাটের জেলে আবদুর রব বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে নদী-সাগরে ইলিশের দেখা ছাড়াই শেষ হতে চলেছে একটি মৌসুম। নদীতে ইলিশ সংকট থাকায় ট্রলার মালিক থেকে জেলে পর্যন্ত সবাই দোনার বোঝা ভারী করে শূন্য হাতে ঘরে ফিরেছেন। ভরা মৌসুমে নদীতে নেই ইলিশ, বিকল্প কোনো কাজ না থাকায় শ্রমনির্ভর মানুষগুলোকে চরম অভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। ঘরে ঘরে অভাব বিরাজ করছে। এই অভাবের সময়ে সরকারি কোনো সহায়তা না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন জেলেরা।

ট্রলার মালিক ইদ্রিস মাঝি বলেন, বড় ফিশিং ট্রলার তৈরি করে জালসহ সাগরে যাওয়ার উপযোগী করতে ২০-২৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে থাকে। এর পর সাগরে পাঠানোর আগে ২০ জন মাঝি-মাল্লারকে ১৫-২৫ হাজার টাকা করে আগাম দিতে হয়। মালিকপক্ষ এই টাকার জোগান দিতে আড়তদারের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়ে থাকে। এই অগ্রিম নেওয়া টাকাকেই জেলেরা দাদন বলেন। দাদনের শর্ত হচ্ছে, দাদনভুক্ত ট্রলারে ধরা মাছ দাদন প্রদানকারী মহাজনের আড়তের মাধ্যমে বিক্রি করতে হবে। বিক্রয়মূল্য থেকে মহাজন শতকরা ৫-৮ টাকা হারে কমিশন কেটে নেবেন।

ঢালচর ঘাটের জেলেরা জানান, মহাজনরা কৌশলে জেলেদের সিন্ডিকেটের সুতায় বেঁধে ফেলেন। সিন্ডিকেটের মতো বুর্জোয়া কৌশলকে ‘ঘাট শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কমিটি’র আদলে জেলেদের সামনে তুলে ধরা হয়। এই কমিটি মোকামের সঙ্গে মিল রেখে ঘাটে মাছের দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে জেলেরা ইলিশের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বছরের পর বছর জেলেরা এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। মৌসুম শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদন আর শেষ হয় না।

সামরাজ ঘাটের জেলে নুরুল ইসলাম মাঝি জানান, জেলেদের খাদ্য সহায়তা হিসেবে বিপুল পরিমাণ চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও এসব চাল প্রকৃত জেলেরা পান না। জেলেদের পাশাপাশি সমাজের নানা পেশার লোকজন নানাভাবে এসব চাল পেয়ে থাকেন।

দাদনের দায় বছরের পর বছর বাড়তে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে ঢালচর ঘাটের মাঝি আব্দুল আলীম জানান, একটি ফিশিং ট্রলার সাগরে যেতে ডিজেলসহ সোয়া লাখ টাকার বাজার নিতে হয়। ১০-১৫ দিন পর ঘাটে ফিরে আসার সময় কখনও কখনও খোরাকির মাছ নিয়ে আসতে পারেন না। ফলে সাগরযাত্রার সোয়া লাখ টাকার খরচের দায় জেলেদের মাথায় বর্তায়। প্রাথমিক দাদনের সঙ্গে খরচটা নতুন দাদন হিসেবে যোগ হয়। এভাবে ট্রিপে লোকসান দাদন হিসেবে গণ্য হতে থাকে। ফলে বাড়তে থাকে দায়।

ঢালচর ঘাটের আড়ত মালিক নুরে আলম জানান, গত মৌসুম শেষে জেলেদের হাতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা দাদন বকেয়া ছিল। এ মৌসুমে আরও সোয়া কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এভাবে নদী-সাগরে ইলিশের সংকটের কারণে দাদনের পরিমাণ আরও ৫০ লাখ টাকা বেড়ে যেতে পারে।
ইলিশ সংকটের কারণ উল্লেখ করে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় নদী-সাগরে ইলিশ কম দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি নদী সংযুক্ত বনগুলোর খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ফলে বিষাক্ত পানিতে ইলিশ প্রজননের ব্যাঘাত ঘটে। এসব কারণে দিন দিন সাগর আর নদনদীতে ইলিশের সংকট দেখা দিচ্ছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর