অস্তিত্ব সংকটে থাকা বড়াল নদীতে নতুন করে আবার শুরু হয়েছে দখল। গত এক সপ্তাহে নদীর অন্তত পাঁচটি স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে ভবন ও দোকানঘর নির্মাণের কাজ চলছে। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে নদীর জায়গা দখল করে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। ফলে পুরোনো দখল উচ্ছেদ না হতেই নতুন করে দখলের বিস্তার ঘটছে।
পদ্মা ও যমুনার সংযোগ রক্ষাকারী একসময়ের প্রবহমান বড়াল এখন স্থানীয়ভাবে ‘মরা বড়াল’ নামে বেশি পরিচিত। দখল ও দূষণে নদীর অনেক অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। উৎসমুখ পদ্মা-বড়ালের মোহনা এলাকায় নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন, পৌরসভার মার্কেট, গণশৌচাগারসহ নানা স্থাপনা। কোথাও কোথাও নদীর ভেতরে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতি ও শুক্রবার বড়াল নদীর শিমুলিয়া, পুঠিমারি ও বাটিকামারী এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর জায়গায় নতুন করে নির্মাণকাজ চলছে। কয়েকটি স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে ভবনের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। কোথাও আবার ঢালাইয়ের রড বের করে রাখা হয়েছে, যাতে পরে ভবনের পরিধি আরও বাড়ানো যায়।
শিমুলিয়া এলাকায় নদীর ভেতরে আরসিসি ঢালাই দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন স্থানীয় মিনারুল ইসলাম। ভবনের বিস্তৃতি বাড়ানোর জন্য ঢালাইয়ের রডও বের করে রাখা হয়েছে। নদী দখল করে নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘কত মানুষই তো ঘরবাড়ি করেছে। কতজনকে বাধা দিয়েছেন? পুরোটা নদীর জায়গা নয়।’
পুঠিমারি-বাটিকামারী এলাকায় নদীর জায়গায় চা দোকান করতেন রবিউল ইসলাম। এখন সেখানে তাঁর ছেলে আল আমিন আরসিসি ঢালাই দিয়ে দুই কক্ষের ঘর নির্মাণ করছেন। একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার এবং অন্যটিতে নিজেদের দোকান করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল ওহাব বলেন, ‘জায়গাটি নদীর। চা বিক্রি করতে করতে এখন ঘর তৈরি করছে। এভাবে দখল হতে থাকলে নদীর তীর বলে কিছুই থাকবে না।’ তবে আল আমিনের দাবি, জায়গাটি তাঁদের নিজস্ব। নদীর জায়গায় নয়, নিজেদের জমিতেই ঘর নির্মাণ করছেন তিনি।
পুঠিমারি এলাকায় কিছুদিন আগে নদীর জায়গা দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন স্থানীয় ইমদাদুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান। তাঁদের ভাষ্য, অনেকেই নদীর পাশে দোকান করেছেন, তাঁরাও করেছেন। সব জায়গা নদীর নয়। সরকারি জায়গা হলে সরকার চাইলে তখন ব্যবস্থা নেবে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বড়াল নদীর দখলদার উচ্ছেদে গত দুই দশকে একাধিকবার তালিকা করা হয়েছে। ২০০৫ সালে নদীর দুই তীরের ৬৮ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়। ২০০৮ সালে হালনাগাদ করে দখলদারের সংখ্যা করা হয় ১১৩ জন। ২০১৯ সালে সরেজমিনে তদন্তে ৫৬ জন এবং ২০২৫ সালে ১০১ জন দখলদারের তালিকা করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশে হালনাগাদ করা তালিকায় দখলদার হিসেবে ১১০ জনের নাম পাঠানো হয়েছে।
সর্বশেষ তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, চারঘাট স্লুইসগেট এলাকায় ২৯ জন, সরদহে ৩ জন, বাটিকামারীতে ২৫ জন এবং আড়ানী বড়াল সেতুসংলগ্ন রামচন্দ্রপুর এলাকায় ৫৪ জন দখলদার রয়েছেন। তবে সম্প্রতি নতুন করে স্থাপনা নির্মাণকারীদের অনেকের নাম এ তালিকায় নেই।
বড়াল রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মী ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, সরকারি তালিকায় দখলদারের সংখ্যা শতাধিক হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘নদী দখলকারীদের তালিকা করে উচ্ছেদ করা তো দূরের কথা, নতুন যারা দখল করছে তাদের বাধা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এসব তালিকা করে লাভ কী? সরকারি হিসাবে দখলদার শতাধিক হলেও বাস্তবে সংখ্যা চার শতাধিক।’
রাজশাহী পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ সরকার বলেন, উচ্ছেদ কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে কাজ চলছে এবং খুব দ্রুত আবারও উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে।
চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মেজবাহীজ্জুলাম চৌধুরী বলেন, ‘দখলকারীদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


