প্রেম ও রোমান্সনির্ভর নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবিতে সরকারের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানোকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের শোবিজ অঙ্গন। যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং সৃজনশীল মেধার বিকাশের স্বার্থে কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর কনটেন্ট নির্মাণ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে ওই নোটিশে। অন্যদিকে, একটি নির্দিষ্ট ঘরানার সৃজনশীল কাজ সামগ্রিকভাবে বন্ধের উদ্যোগকে শিল্পের স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক উল্লেখ করে যৌথ প্রতিবাদ জানিয়েছে টেলিভিশন ও অডিওভিজ্যুয়াল অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ আইনি নোটিশ পাঠান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নোটিশের প্রাপক করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রেম ও মাত্রাতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের আধিক্যের কারণে সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ারের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ছে বলেও দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি নাটক-সিনেমায় পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত করে দেখানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। নোটিশদাতার দাবি, এ ধরনের উপস্থাপন সমাজের প্রচলিত নৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমে অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শনের সঙ্গে সামাজিক নৈরাজ্য এবং পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলেও নোটিশে দাবি করা হয়েছে। তবে এই সম্পর্কের পক্ষে নোটিশে কোনো গবেষণা বা পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশিত সংবাদগুলো থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত নোটিশদাতার অভিযোগ ও যুক্তি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, কী বানাতে হবে সেটিও বলা হয়েছে
নোটিশে শুধু প্রেম ও রোমান্সনির্ভর নাটক-সিনেমায় বিধিনিষেধের দাবি জানানো হয়নি। এর পরিবর্তে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর নির্দেশনা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং সে বিষয়ে নোটিশদাতাকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়েরের কথা বলা হয়েছে।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের আইনবহির্ভূত বা এখতিয়ারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আদেশ বা নির্দেশ দিতে পারে।
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—আইনি নোটিশ নিজে কোনো আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা সরকারি আদেশ নয়। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি বা আইনি পদক্ষেপের পূর্বধাপ হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে এই মুহূর্তে প্রেমভিত্তিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সৃজনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
আইনি নোটিশের পরই এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে টেলিভিশন ও অডিওভিজ্যুয়াল অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর নিকেতনে যৌথ প্রতিবাদলিপিতে তারা বলেছে, বাংলাদেশের টেলিভিশন ও অডিওভিজ্যুয়াল শিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের সংস্কৃতি, বিনোদন, সৃজনশীলতা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, কোনো নির্দিষ্ট কনটেন্ট নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় তার প্রতিকার করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একটি সম্পূর্ণ সৃজনশীল মাধ্যমের একটি নির্দিষ্ট ঘরানার নির্মাণ সামগ্রিকভাবে বন্ধের উদ্যোগ সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে টেলিভিশন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল কার্যক্রমও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংগঠনগুলো অবশ্য দায়িত্বশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, সৃজনশীল স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি নির্মাতা ও শিল্পীদেরও দর্শকের প্রতি দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
প্রতিবাদে সাত সংগঠন
যৌথ প্রতিবাদলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল হাসান, অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের সভাপতি শিহাব শাহীন ও সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দীন সুমন, ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক সাহিল রনি, অডিও-ভিজ্যুয়াল টেকনিক্যাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাদেক সিদ্দিকী, টেলিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরস অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক রাজ্জাক রাজ এবং বাংলাদেশ মেকআপ আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব রহমান মানিক।
তাদের সম্মিলিত বক্তব্য—রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণ সামগ্রিকভাবে বন্ধের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে টেলিভিশন শিল্পের সৃজনশীল স্বাধীনতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের কর্মক্ষেত্র এবং দেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।


