তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত ফেব্রিক্স বা কাপড় আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞায় রপ্তানি সক্ষমতা কমবে দেশের। বিদেশি ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী লিড টাইম বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে ব্র্যান্ড-ক্রেতারা বাংলাদেশের বিকল্প উৎস দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ ও রপ্তানি কমবে।
সরকারের নতুন আমদানি নীতিতে নিট কাপড় আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত বিধান বাতিল করার দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের কাছে লেখা পৃথক চিঠিতে সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৪ আগস্ট ২০২৬-২৯ সাল মেয়াদের আমদানি নীতি ঘোষণা করে। আমদানি নীতির ধারা-২৫-এ বলা হয়, ‘শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ আমদানির শর্তাবলির উপধারা-১২ নিট ফেব্রিক্স আমদানি যোগ্য হইবে না।’ এ নীতির কারণে নিট ফেব্রিক্স আমদানি নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা। নতুন আমদানি নীতি ঘোষণার আগের এলসির ভিত্তিতে আমদানি করা অনেক নিট ফেব্রিক্স চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করতে সমস্যা হচ্ছে। আগে খোলা এলসির নিট ফেব্রিক্সও বন্দরে আসার পথে রয়েছে। ওইসব চালান খালাসেও সমস্যা হবে। এতে স্বাভাবিক রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
নিট ফেব্রিক্স আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলো। নিট পোশাক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্সের বড় একটা অংশ, প্রায় ৯০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। বাকি ১০ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া দেশে সহজলভ্য হলেও ব্র্যান্ড-ক্রেতারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি ফেব্রিক্স ব্যবহারে শর্ত দিয়ে থাকে। তখন আমদানি করা ছাড়া উপায় থাকে না।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, এর আগে কখনও এ রকম নীতি সংকটের মুখে পড়তে হয়নি। নতুন আমদানি নীতির খসড়া নিয়ে অংশীজনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। তখন প্রতিবাদ করলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিধানটি ভুলক্রমে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চূড়ান্ত করার আগে এ ধারা বাদ দেওয়া হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় চূড়ান্ত নীতিমালায় নিট ফেব্রিক্স আমদানি নিষেধের বিষয়টি বহাল রয়েছে। এটা কিছুতেই মানা যায় না। বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, এ বিষয়ে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছেন তারা। না হলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের চেয়েও এই সংকট আরও প্রকট হবে শিল্পের জন্য।
বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে লেখা বিকেএমইএর চিঠিতে বলা হয়, রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনায় ক্রেতাদের নির্দেশ অনুযায়ী দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয় তাদের। বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে নিট পোশাকের ফেব্রিক্স উৎপাদন ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা, নির্ধারিত মান ও ডিজাইন, পণ্যের বৈচিত্র্য ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনে বিদেশি ফেব্রিক্স বেশি আমদানি করতে হয়। এ বাস্তবতায় আমদানি নীতিতে নিট ফেব্রিক্স আমদানি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত বা প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।
নিট ফেব্রিক্স আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিকেএমইএর মতো প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নয় তৈরি পোশাকের ওভেন পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যেক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য
কারখানাগুলো। তবে বিজিএমইএর
অনেক সদস্য একই সঙ্গে বিকেএমইএরও সদস্য। এ ছাড়া ফ্যাশনেবল সিনেথেটিক নিট পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি করে থাকে অনেক ওভেন কারখানা। সে হিসেবে নতুন আমদানি নীতিতে নিট ফেব্রিক্স আমদানি নিষেধাজ্ঞায় বিজিএমইএ-ও ক্ষতিগ্রস্ত।
বাণিজ্যমন্ত্রীকে পাঠানো বিজিএমইএর চিঠিতে সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ কারণে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হয়। নির্ধারিত মান, ডিজাইন বজায় রাখা ও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয়। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের কাপড় সংগ্রহ করতে হয়। এ ধরনের আমদানির সুযোগ সীমিত হলে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট মান, সুনির্দিষ্ট ধরন, রং, ডিজাইন ও ধরনের কাপড় অনেক সময় স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় না। ফলে এসব ক্ষেত্রে বিদেশি উৎস থেকে ফেব্রিক আমদানি করতে হয়। নতুন নীতির সংশ্লিষ্ট বিধান বহাল থাকলে রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা সৃষ্টি হবে।
চিঠিতে বিজিএমইএ বলেছে, রপ্তানির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সমীচীন হবে না। এতে রপ্তানি সক্ষমতা কমবে এবং রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। এই বাস্তবতায় দেশে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আগের মতো বহাল থাকা জরুরি। ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে অথবা ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) বা বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় নিট কাপড় আমদানির সুযোগ বহাল রাখার অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।


