হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা

প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় মুন্সীগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমে অবনতির দিকে যাচ্ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাস পাঁচ দিনে এই জেলার ছয়টি উপজেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৮৪৫ জন। এর মধ্যে জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন এক হাজার ৫১২ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন আরও ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৭২ জন। ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫৬ জন। গত আগস্ট মাসে মুন্সীগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮১২ জন। এ ছাড়া চলতি মাসে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩০ জন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, আগস্ট মাসে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮১২। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ৬৭২, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৭, শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৯, সিরাজদীখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৯, লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২ এবং গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৩ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই জেলায় প্রতিদিন বেড়ে চলেছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। এই পরিস্থিতিতে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ২৫০ শয্যার হাসপাতালের নতুন ছয়তলা ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলার বারান্দায় নারী, শিশু ও পুরুষ ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক। এ ছাড়া একাধিক রোগী মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

একই পরিস্থিতি পাঁচটি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও। সেখানেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি। এখনও জ্বর, শরীর ব্যথা, বমি, ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন রোগীরা।
জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫১২। প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় মুন্সীগঞ্জ জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
পরিসংখ্যান বলছে, জুন মাস থেকে মুন্সীগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। গত বছর ১২ মাসে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪১০। আর চলতি বছরে আট মাস পাঁচ দিনে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৪৫ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে, দিনের বেলায় এডিস মশার কামড় থেকে সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরিফুজ্জামান জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে রেফার্ড করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকায় রেফার্ড করা রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে এসব মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হচ্ছে না। ফলে জেলার ডেঙ্গু আক্রান্ত
ও মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগম বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। জুলাই ও আগস্ট মাসের ন্যায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসেও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে রোগীর সংখ্যা। এই পরিস্থিতিতে জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি। সিভিল সার্জন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা ও অন্যান্য পানির আধার নিয়মিত পরিষ্কার রাখার জন্য জেলার বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর