পরিবার ঘরজুড়ে এখন পাঁচ শিশুর কোলাহল

দশ বছর ধরে অপেক্ষা। কত প্রার্থনা, কত আকাঙ্ক্ষা! সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন নিয়ে দিনের পর দিন কেটেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার এনি আক্তার ও ওয়াহিদুল ইসলামের। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের মুখ দেখেন।

দুটি ছেলে ও তিনটি মেয়ে। নাম ফাহাদ, হাদী, জান্নাত, সুমি ও আরিশফা। এখন এই দম্পতির ঘরজুড়ে পাঁচ শিশুর কোলাহল। ওরা মাতিয়ে রাখছে পুরো পরিবার। সবচেয়ে খুশির খবর, জন্মের ৯ মাস পর ওরা পাঁচ ভাইবোন সুস্থ আছে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশও ঘটছে ঠিকমতো।

১০ বছরের অপেক্ষা
বিয়ের পর সন্তান চেয়েছিলেন এনি ও ওয়াহিদুল। কিন্তু এক বছর, দুই বছর করে কেটে যায় সময়। একসময় সেই অপেক্ষা গড়ায় এক দশকে। সন্তানের মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও পূরণ হচ্ছিল না তাদের স্বপ্ন। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তারা। স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফরিদা ইয়াসমিন সুমির পরামর্শে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি আইইউআই বা ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন পদ্ধতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই কৃত্রিম পদ্ধতিতে স্বামীর ভালো মানের শুক্রাণু সরাসরি এনির জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।

এনি-ওয়াহিদুলের ক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টাতেই আসে সাফল্য। এনি অন্তঃসত্ত্বা হন। তবে কিছুদিন পরই জানতে পারেন, তাঁর গর্ভে একটি নয়, পাঁচটি সন্তান বেড়ে উঠছে। এমন খবর আনন্দের হলেও এর সঙ্গে ছিল শঙ্কা। কারণ, একসঙ্গে এতগুলো শিশু গর্ভে থাকলে গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পাঁচটি ছোট্ট প্রাণ
নির্ধারিত সময়ের আগেই গত বছরের ৮ ডিসেম্বর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পাঁচ শিশুর জন্ম হয়। দুজনের ওজন ছিল মাত্র এক কেজি। অন্য তিনজনের ওজনও দেড় কেজির কাছাকাছি। পাঁচ নবজাতককে নেওয়া হয় নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ)।

চিকিৎসক ফরিদা ইয়াসমিন সুমি বলেন, একই সঙ্গে পাঁচ নবজাতকের অস্ত্রোপচার করা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তাদের প্রত্যেকের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘মায়ের গর্ভে একসঙ্গে পাঁচ শিশু থাকায় অস্ত্রোপচার করতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তাছাড়া এটি ছিল ওই দম্পতির বিয়ের ১০ বছর পর প্রথম প্রসব। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি তখন খুবই জটিল ছিল।’

চিকিৎসক সুমি বলেন, জন্মের পরপরই শিশুদের এনআইসিইউতে নিতে হয়েছিল। কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর পাঁচ শিশুকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি নিয়ে যান তাদের মা।

ঝুঁকি ছিল অনেক
চিকিৎসক ফরিদা ইয়াসমিন সুমি আরও বলেন, একসঙ্গে একাধিক সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে অপরিণত জন্ম ও কম ওজন বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব শিশুর ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি পরিণত না-ও হতে পারে। তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও তুলনামূলক দুর্বল থাকে। সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এত কম ওজন নিয়ে জন্মের পর পাঁচ শিশুই পুরোপুরি সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। এটি সত্যিই আনন্দের ব্যাপার।

ঘরজুড়ে শুধু আনন্দ
এনি ও ওয়াহিদুল এখন সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত। ঘুমের সময় কমেছে। তবে আনন্দ বেড়েছে।

এনি বলেন, ‘আমি চাইতাম আমার একটা সন্তান হবে। ও আমাকে মা বলে ডাকবে। আল্লাহর কাছে সন্তান চেয়ে কত কান্নাকাটি করেছি! বিয়ের ১০ বছর পর আমার কোলজুড়ে এলো পাঁচ সন্তান। ওরা এখন মা মা মা, বাবা বাবা বলে ডাকে। এই ডাক শুনে কী যে ভালো লাগে!’

ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রার্থনা করি, যেন আমাদের এই পাঁচ সন্তান সুস্থ থাকে। একসঙ্গে হেসে-খেলে বেড়ে ওঠে।’

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর