জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আঁওড়া গ্রামের মকবুল হোসেন গত মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। সে সময় বিক্রি না করে সব আলু রেখেছিলেন হিমাগারে। কিন্তু এখন লাভ তো হচ্ছেই না, উল্টো লোকসানের কারণে চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।
গত সোমবার সকালে এম ইসরাত হিমাগার গেটে কথা হয় মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘বেশি দামে বিক্রির আশায় সব আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন বিক্রি করলেই বস্তাপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ঋণ শোধ করা দূরের কথা, দিন দিন দেনার বোঝা বেড়েই চলেছে। কী করব, কূলকিনারা পাচ্ছি না।’
বেশি দামের আশায় পুনট হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন সড়াইল গ্রামের কৃষক মোকলেছুর রহমান। আলু বিক্রি করতে এসে হিমাগারের ভাড়ার কথা ভেবে তিনি বিক্রি না করে ফিরে যাচ্ছিলেন। এ সময় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, তখন আলু বিক্রি করলে আজ হিমাগারের ভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না।
শুধু মকবুল হোসেন কিংবা মোকলেছুর রহমানই নন; তাদের মতো জেলার অনেক চাষি হিমাগারে আলু রেখে বিপাকে পড়েছেন। তাদের সঙ্গে বিপদে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরাও। দাম কম হওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন না করায় খরচ বেড়েছে হিমাগার মালিকদের। লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা চাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ২২টি হিমাগারে এবার ২ লাখ ১৬ হাজার টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে। দাম কম হওয়ায় এখনও সিংহভাগ আলু হিমাগারেই রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এত আলু বাজারে বের করতে হলে সরবরাহ বাড়াতে হবে। এতে আলুর দাম আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নতুন মৌসুমে আগাম আলু রোপণ শুরু হয়েছে। এই আলু বাজারে এলে পুরোনো আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার ভয়ে আছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
আলু ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে আলুর যে দাম, তাতে বস্তাপ্রতি গড়ে ৪০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ঋণের বোঝাও বেড়ে গেছে। সিসি ঋণ এবার নবায়নই করতে পারিনি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। সরকার দ্রুত আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিলে বাজারদর কিছুটা বাড়তে পারে। তাতে লাভ না হলেও অন্তত মূলধন রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসার অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজু আলম সরকার বলেন, গত মৌসুমে জেলায় ব্যাপক আলু উৎপাদন হয়েছে। সরবরাহ বেশি থাকায় প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু নিয়ে বিপাকে আছেন। চাহিদা কম থাকায় বাজারে আলুর দাম কম। ফলে হিমাগারে মজুত রাখা আলু উত্তোলন করছেন না কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন, পরিবহন, হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি ৬২ কেজি ওজনের বস্তায় গড়ে প্রায় ৪৬০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
উপজেলার বারাইপাড়া গ্রামের মকছেগ আলী, আমড়া গ্রামের রশিদ মণ্ডল ও খড়মপুর গ্রামের আবদুল মালেকসহ কয়েকজন চাষি জানান, আলুর বাজার নিম্নমুখী হওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করলে বস্তাপ্রতি গড়ে ৪৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে উপজেলায় এক হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ৩৭ হাজার ২৫০ টন।
এদিকে, আমন ধানের মৌসুম শুরু হওয়ায় কৃষকদের জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে অর্থের প্রয়োজন। সাধারণত এ সময় হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করে এসব খরচ মেটান চাষিরা। কিন্তু এ বছর দাম কম থাকায় আলু বিক্রি করতে না পারায় একদিকে হিমাগারে মূলধন আটকে আছে, অন্যদিকে আমন চাষের অর্থ জোগাড়েও সংকট দেখা দিয়েছে।
আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। ফুলবাড়ী পৌরবাজারের ব্যবসায়ী বিধান দত্ত ও জয়ন্ত সাহা জানান, বিভিন্ন বাজারে আলু পাঠিয়েও লাভ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি ট্রাকে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী কেনাবেচা করছেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমেছে। বাজার সচল করা এবং কৃষক যাতে যৌক্তিক দাম পান, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।


