কীটতত্ত্ববিদদের বারবার সতর্কতা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় নির্দেশিকা থাকার পরও কার্যকর হচ্ছে না ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। রাজধানীসহ দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দেশিকা অনুযায়ী মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরেও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন আরও ৯ জন। চলতি বছর এক দিনে এটাই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৯০২ জন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে প্রায় ৩০০ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কোনো হাসপাতালে শয্যা না থাকলে রোগীকে নির্ধারিত অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
মানা হচ্ছে না জাতীয় নির্দেশিকা
মশক নিয়ন্ত্রণে ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়। এরপর রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের জন্য প্রণয়ন করা হয় ‘মশক নিধন স্থায়ী নির্দেশিকা’। দুই নির্দেশিকাতেই মশক নিয়ন্ত্রণে করণীয়, মশককর্মী, তদারককারীসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী ছয় মাসের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু স্থানীয় সরকারের একাধিক স্তরে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের কর্মপরিকল্পনা কোনো পর্যায় থেকেই স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়নি।
নির্দেশিকায় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনকে প্রতি মাসে মশার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কথাও রয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমিটি আছে বা থাকার কথা এমন তথ্যই অনেকে জানেন না।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে মশার বিস্তার সম্পর্কে প্রতি মাসে চেয়ারম্যানকে জানানোর কথা রয়েছে। বিভিন্ন এলাকার বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাদের কেউই এ কাজ করেননি। এমনকি জাতীয় নির্দেশিকার বিষয়েও তাদের অনেকের জানা নেই।
সিটি করপোরেশনও মানছে না নির্দেশিকা
জাতীয় ও স্থানীয় নির্দেশিকার শুরুতেই বছরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ময়লা, পচা পানি, নালা-নর্দমা, ড্রেন, সেপটিক ট্যাঙ্ক, জলাভূমি, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত পাত্রে সকাল-বিকেল ওষুধ প্রয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া লার্ভা ধ্বংসে সকালে এবং উড়ন্ত মশা নিধনে বিকেলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।
কোনো বাসাবাড়ির ভেতরে এডিস মশার প্রজননস্থলের তথ্য পাওয়া গেলে সেখানে ওষুধ প্রয়োগ বা ফগিং করে উৎসস্থল ধ্বংস করার কথা। এ ক্ষেত্রে ভবন বা অবকাঠামোর মালিকের কাছ থেকে নির্ধারিত কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিউলেক্স মশার ক্ষেত্রে কোনো ভবন মালিক তার ভবনের বেজমেন্ট বা অভ্যন্তরে ওষুধ ছিটাতে চাইলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে আবেদন করার কথা। বাস্তবে এমন আবেদন খুব একটা হয় না। কেউ কেউ মৌখিকভাবে স্থানীয় কাউন্সিলরকে ফোন করে বাসার নিচে ওষুধ ছিটানোর অনুরোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে মশককর্মীদের দেখলে বাসিন্দারা তাদের অনুরোধ করে বাসার ভেতরে ওষুধ ছিটিয়ে নেন। আবার অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে মশককর্মীরা বাড়ির ভেতরে ওষুধ ছিটান না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, গত তিন বছর তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে মশা নিধনে ব্যবস্থা নিয়েছেন। তবে এটি কার্যকর পদ্ধতি নয়। তাই তারা নিজেরাই মশার উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করছেন। ঢাকার বড় ১০ হাসপাতাল থেকে এক হাজার ৬৭২টি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে একশটি এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। সেই জায়গাগুলোতে দৈনিক ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবী দিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সারাদেশে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিধনে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এখন তাদের পরিকল্পনা হলো হাসপাতাল, স্কুল ও মন্দিরে কীটনাশক ছাড়াই এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশা ধরতে আধুনিক ফাঁদ ‘বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ’ বসানো। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিসের লার্ভা ধ্বংসে ওষুধ প্রয়োগ এবং পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সারাদেশে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে।
ইমরুল কায়েস বলেন, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি এবং পরিত্যক্ত পাত্রে এডিস মশার প্রজনন হয়। তাই সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জমে থাকা পানি অপসারণে সাধারণ মানুষের সচেতনতা জরুরি।
২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৯০২
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের বুলেটিন অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ২০৬ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২২৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০১ জন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ২১৬, চট্টগ্রামে ২৭২, খুলনায় ৩০৬, ময়মনসিংহে ৯৮, রাজশাহীতে ১০৫, রংপুরে ৬৬ এবং সিলেটে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে এক হাজার ৯৮৮ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ৭৭৪। এ মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। সব মিলিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৬০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। গত বছর ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় এক লাখ দুই হাজার রোগী শনাক্ত হন।
শুধু প্লাটিলেট নয়, গুরুত্ব তরল ব্যবস্থাপনায়
ডেঙ্গু চিকিৎসায় দায়িত্ব পালন করা ঢাকার ১০টি বড় হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়ে গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক করা বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন সরবরাহ করা হয়েছে। তবে কিছু রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসকরা বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় শুধু প্লাটিলেট কমে যাওয়াকে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে দেখার ধারণা বদলেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্লাজমা লিকেজসহ রোগীর শরীরে তরলের ভারসাম্য ঠিক রাখা এবং জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করাই চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা প্রটোকল নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন সরবরাহ করা হয়েছে। তবে কিছু রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। তবে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
যা বললেন বিশেষজ্ঞরা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার বলেন, আমরা আগেই ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা করেছিলাম। বারবার মশা নিধনের পরামর্শ দিয়েছি। তারপরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এক ধরনের অবহেলা দেখা গেছে।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি মাসে ডেঙ্গুতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি আগামী মাস পর্যন্ত চলার আশঙ্কা রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানান এ কীটতত্ত্ববিদ।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই মানুষ ডেঙ্গুর নতুন ধরনে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের মধ্যে যাদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। শুধু ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া শিশু নয়, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ, শিশুরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
সরকারি হাসপাতালে বাড়ছে শয্যা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে ৩০০ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বিভিন্ন ওয়ার্ডের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে অতিরিক্ত রোগী রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেখানে একটি মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কোনো হাসপাতালে শয্যা না থাকলে নির্ধারিত অন্য হাসপাতালে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এসব শয্যাও পূর্ণ হয়ে গেলে আরও জায়গা প্রস্তুত করার নির্দেশনা রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করছে কিনা, তা যাচাই করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো হাসপাতাল রোগী নিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।


