মধ্য এশিয়ায় চীন-রাশিয়ার বলয়ে প্রভাব বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার একাধিক ফ্রন্টে জড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের তৎপরতা থেমে নেই। চীন-রাশিয়ার বিপরীতে নিজেদের প্রভাব শক্ত করতে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। লক্ষ্য একাধিক চুক্তি করা।

এই সফরে রুবিওর প্রথম গন্তব্য উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর সমরকন্দ। সঙ্গে আছে ২০০ ব্যবসায়ী নেতার প্রতিনিধি দল। সোমবার সমরকন্দে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের মন্ত্রীদের একটি বৈঠকে যোগ দেবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার রওনা দেওয়ার সময় এই সফরকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন রুবিও। তিনি বলেন, ‘এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে এমন কিছু দেশ আছে, যাদের সঙ্গে আমরা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।’

এই সফর উপলক্ষে গত শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, মধ্য এশিয়াজুড়ে অংশীদারত্ব গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের প্রতি ওয়াশিংটন সদিচ্ছা দেখাচ্ছে।

কেন সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
মধ্য এশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতোই সম্পদসমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। বিপরীতে জনসংখ্যা মাত্র ৮ কোটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঊর্ধ্বতন এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, তারা কয়েক মাস ধরে এই অঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনা করেছেন। বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করার এটি সেরা সুযোগ।

সমরকন্দকে ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের প্রতীকী বিরতিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন রুবিও। গত বছরের নভেম্বরে এই দেশগুলোর নেতাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দেশগুলো এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল। জ্বালানি পাইপলাইনের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও অভিবাসন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশগুলোর ওপর মস্কোর প্রভাব কমে গেছে। বর্তমানে এর সুবিধা নিচ্ছে চীন।

বেইজিং মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশেরই প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। তাদের সঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলো জ্বালানি-সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে তারা তুর্কমেনিস্তানে প্রাকৃতিক গ্যাস, কাজাখস্তানে ইউরেনিয়াম ও তাজিকিস্তানের বিরল মৃত্তিকা উপাদান (রেয়ার আর্থ) কেনার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি বিরল মৃত্তিকা উপাদান সংগ্রহ ও জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনার মতো বিষয়গুলোকে পররাষ্ট্রনীতির মূল অংশ বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক দূতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি এই অঞ্চলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর বারবার জোর দিয়েছেন।

বাণিজ্য চুক্তি
উজবেকিস্তান সফরের পর ভারতে যাবেন রুবিও। সেখানে তিনি মুম্বাই ও গুজরাটের জামনগরে যাত্রাবিরতি দেবেন। দুটি শহরই আন্তর্জাতিক বন্দর ও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

গত মে মাসে নয়াদিল্লি ও কলকাতা সফর করেছিলেন রুবিও। চার মাসের ব্যবধানে এটি তাঁর দ্বিতীয় দফায় ভারত সফর। যা এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের জোরালো তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঊর্ধ্বতন এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন একটি বাণিজ্য চুক্তির খুব কাছাকাছি আছে।

ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে উভয়পক্ষ অস্থায়ী চুক্তি করে। কিন্তু এর কয়েকদিন পর, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপ করা পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করে দেয়। এর ফলে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

আদালতের রায়ের পর চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করে দুই দেশ। কিন্তু মস্কোর কাছে থেকে দিল্লি তেল কেনা অব্যাহত রাখলে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে আবার টানাপোড়েন দেখা দেয়। পরে ওই শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মুম্বাই ও জামনগরে ভারতীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় রুবিও নতুন ধাঁচের ‘বাণিজ্যিক কূটনীতি’র প্রস্তাব দেবেন। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি তেল শোধনাগারে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের অর্থায়নের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর