রাশিয়ার ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানান, কংগ্রেসের পাস করা আইনের আওতায় রাশিয়ার ওপর প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক কার্যকর করা থেকে আপাতত বিরত থাকছেন। জাতীয় স্বার্থের জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয়।

প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের উদ্যোগে আনা আইনটিতে গত মাসে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। আইনটির আওতায় রাশিয়ার কর্মকর্তা ও ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ব্যবহৃত ট্যাঙ্কারের গোপন বহরকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা ছিল। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা শীর্ষ পাঁচটি দেশের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।

তবে যেসব দেশ তাদের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ১৫ শতাংশের কম রাশিয়া থেকে নেয় এবং আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প সেগুলো স্থগিত করেন।

গত মাসে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’-এর লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়ন কমাতে দেশটির আর্থিক প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা।

ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন তিনি প্রকাশ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন। একই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতির খবরও সামনে এসেছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল আসবে। এ ছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়া আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে।

এ ঘোষণার পর ছয়জন রিপাবলিকানসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর ট্রাম্পের কাছে ডিজেল চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানান। তাদের আশঙ্কা, এ চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া নতুন করে অর্থ পাবে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেশটিকে সহায়তা করতে পারে।

মঙ্গলবার উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের একটি দল ট্রাম্পের কাছে চিঠি পাঠিয়ে গত মাসে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আহ্বান জানায়। আইনটির আওতায় রাশিয়ার জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করা হবে, নাকি অব্যাহতি দেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য ট্রাম্পের হাতে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সময় ছিল। তবে এ বিষয়ে প্রশাসন আইনপ্রণেতাদের কিছু জানায়নি।

ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শুক্রবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের চুক্তির অর্থ হলো দেশটিতে আবারও অর্থপ্রবাহ শুরু হবে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এতে মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এদিকে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম গোয়েন্দা তথ্য কিয়েভের কাছ থেকে গোপন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন—এমন অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর কার্যকারিতাও সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা ড্রোনে এটি ব্যবহার করা না যায়। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনটি লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলাইন গ্রাহামের নির্বাচনী প্রচারণারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য ডারলাইনকে সিনেটে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সিনেটে ভাইয়ের স্থলাভিষিক্ত হতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ সপ্তাহের শুরুতে সাউথ ক্যারোলিনার ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুসের সঙ্গে এক বিতর্কে ডারলাইন গ্রাহাম বলেন, আইনটি পাসে সহায়তা করতে পেরে তিনি ‘খুবই গর্বিত’। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া ডারলাইন আগামী সপ্তাহে সাউথ ক্যারোলিনায় তাঁর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে আইনটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা সম্পূর্ণ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

কলম্বিয়ায় আয়োজিত ওই বিতর্কে ডারলাইন গ্রাহাম বলেন, এই আইনটি প্রেসিডেন্টকে এমন কিছু হাতিয়ার দেয়, যা তিনি চাইলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি এটি ব্যবহার করবেন কি করবেন না, কিংবা অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করবেন কি না—তা তাঁর ওপরই নির্ভর করে। তবে আমার মতে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানির দাম কমিয়ে আনা এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করা। আর যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দামও কমে আসবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর