শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা ছুটিতে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। সাগরের নীল জলরাশি আর ঢেউ দেখার টানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। বিপুল লোকসমাগম ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা।
কক্সবাজার শহরের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজগুলোতে চাপ বেড়েছে। হোটেলমালিকরা বলছেন, ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটক আসা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই শঙ্কা কেটে পর্যটকের ভিড় বেড়েছে। দুর্গাপূজা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি মিলিয়ে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০ দিনে কক্সবাজারে ১০ লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এ সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন তারা।
হোটেলমালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার অন্তত তিন লাখ পর্যটক সৈকত ভ্রমণ করেছেন। রোববার থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিন সরকারি ছুটি। এরপর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক এবং ২৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপূজার ছুটি। এই দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, তারকামানের ২০টির বেশি হোটেলে প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ এবং মাঝারি আকারের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলোও এক-দুই দিনের মধ্যে বুকিং হয়ে যেতে পারে। এবার কক্ষভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রশাসন তদারকি করছে।
গতকাল বুধবার সকালে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন পর্যটকরা। কেউ সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউ ছবি তুলে স্মরণীয় করে রাখছেন ভ্রমণের মুহূর্ত। অনেকে ঘোড়া, বিচবাইক ও জেটস্কিতে চড়ার পাশাপাশি সাগরে গোসল করছেন। কেউ বালুচরে ছাতা-চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছেন। অনেকে ঘোড়ার পিঠে বা বিচবাইকে ঘুরছেন। দক্ষিণের সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।
সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার ব্যবসায়ী রাসেল চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজার আসেন। কলাতলীর একটি হোটেলে ওঠার পর সকালে সুগন্ধা সৈকতে যান। সেখানে মানুষের ভিড় দেখে পরিবার নিয়ে চলে আসেন লাবণী পয়েন্টে। রাসেল বলেন, লাবণী পয়েন্টেও হাজারো মানুষের সমাগম দেখেছেন।
তারকামানের হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব জানান, তাদের হোটেলের ৮৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অতিথির চাপ থাকবে বলে আশা করছেন তারা।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, এবারের ছুটিতে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হলে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।
পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সৈকতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। লাইফগার্ড ও নিরাপত্তাকর্মীরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ সমুদ্রস্নান নিরাপদ করতে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন সি-সেইফ লাইফগার্ডের সদস্যরা।
জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানেও পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। মেরিনড্রাইভ, হিমছড়ি ঝর্ণা, দরিয়ানগর, ইনানী, পাটুয়ারটেকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও ভ্রমণপিপাসুদের উপস্থিতি নজর কেড়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের এএসপি ফাহিম ফয়সাল বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সৈকতসহ সব পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া এসআরবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও আনসার সদস্য নিয়োজিত রয়েছে।
ছুটি ও কার্নিভাল ঘিরে জমজমাট কুয়াকাটা
দুর্গাপূজার ছুটি ও পর্যটন কার্নিভাল ঘিরে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পর্যটক সমাগম বেড়েছে। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সৈকত ও আশপাশের দর্শনীয় স্থান। হোটেল-মোটেলের বুকিং, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বেড়েছে ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে কার্নিভালকে ঘিরে কুয়াকাটার পর্যটন খাতে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাঞ্চল্য।
গতকাল কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন। আবার অনেকে সৈকতের বালুকাবেলায় ঘুরে উপভোগ করছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য।
পর্যটকদের আগমনে আবাসিক হোটেল-মোটেলগুলোতে দেখা যাচ্ছে মিশ্র চিত্র। কোনো কোনো হোটেলে কয়েক দিনের জন্য শতভাগ কক্ষ বুকিং থাকলেও অন্য দিনগুলোতে বুকিং কমে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
হোটেল ডি’মোরের পরিচালক জয়নুল আবেদিন জুয়েল বলেন, আমাদের মোট রুম ৫৭টি। ২১ ও ২২ অক্টোবর শতভাগ বুকিং থাকলেও ২৩ অক্টোবর ৫০ শতাংশ বুকিং রয়েছে। তবে ২৪ অক্টোবর কোনো বুকিং নেই। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার এমজি মোর্শেদ খান বলেন, আমাদের মোট ৪৩টি রুম। আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সব রুমের শতভাগ বুকিং রয়েছে।
গাজীপুর থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা লায়লা শিরিন বলেন, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। সমুদ্রের ঢেউ, বিশাল সৈকত আর মনোরম পরিবেশ পরিবারের সবাইকে আনন্দ দিয়েছে। দুর্গাপূজার ছুটিতে ঘুরতে এসে কার্নিভালের আমেজও উপভোগ করতে পারছি।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটায় তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল-মোটেল রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলে প্রায় ৪০ হাজার পর্যটকের ধারণক্ষমতা রয়েছে। বুধবার লক্ষাধিক পর্যটকের আগমন ঘটেছে।
পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। বিশেষ করে রাখাইন পল্লি মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ
নাজমুল আহসান।


