টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে চাপে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে  পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে রপ্তানিকারকদের।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী টাইমের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের এ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কীভাবে চাপে পড়ছে, তার চিত্র তুলে ধরতে শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান
হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে এতে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার আশুলিয়ার হা-মীম গ্রুপের কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালু করতে হয়। গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহেও ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এতে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়।

এতে বলা হয়, হা-মীম গ্রুপের দৈনিক জ্বালানি ব্যয় আগে প্রায় দুই লাখ ডলার থাকলেও এখন তা বেড়ে তিন লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অথচ ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি চাহিদা মেটাতে হা-মীম গ্রুপের কারখানার ছাদে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা দিয়ে সার্বক্ষণিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। দিনের সর্বোচ্চ রোদের সময় সৌরবিদ্যুৎ থেকে কার্যকর সুবিধা পাওয়া যায় মাত্র চার ঘণ্টা। ফলে শিল্পকারখানার নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি চাহিদা মেটাতে শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করা কঠিন।
হা-মীম গ্রুপের হেড অব পাওয়ার, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি তনুল চক্রবর্তী টাইমকে বলেন, বাংলাদেশে গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ ভালো নয়, ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটে। গ্যাসের পর ডিজেলই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। গ্রিডের বিদ্যুৎ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই যেন ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
টাইমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর খোলাবাজারে এলএনজির দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। গত জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে দেশে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক সংকটের পাশাপাশি অতীতে দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত  দুর্বলতাও  জ্বালানি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগ হয়েছে। ফলে  দেশের জ্বালানির প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়।
টাইমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত তিন বছরে নানা কারণে ৪০০টির বেশি ছোট পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য জ্বালানি সংকট বড় উদ্বেগের কারণ। এ খাতে সরাসরি ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর বাইরে অসংখ্য মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা শুধু পোশাকশিল্প নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর