খাদ্য ব্যবসায় লাগবে নিবন্ধন, হয়রানির শঙ্কা ব্যবসায়ীদের

0
1

দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সব খাবার দোকানকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন নিতে হবে। নির্দিষ্ট ও বিশেষ ধরনের খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে নিতে হবে লাইসেন্স। এভাবে রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান– সবাই সরকারের নির্ধারিত আইনি কাঠামোর আওতায় আসবে।
সম্প্রতি জারি করা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক নতুন প্রবিধানমালায় এসব কথা বলা হয়েছে। এ নিয়ে ব্য়বসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ও নিরাপত্তার ছাড়পত্র নিতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। বর্তমানে ১২টি সরকারি সংস্থা আলাদাভাবে তদারকি ও অভিযান চালানোর নামে তাদের নিয়মিত হয়রানি করে। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি, পুরো খাতটি একটি কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার অধীনে পরিচালিত হোক। কিন্তু তা না করে নতুন করে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা মানে আরেকটি বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। এতে ‘লাইসেন্স বাণিজ্যের’ সুযোগ তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন। তাদের মতে, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া শুধু একটি বিধিমালা দিয়ে বিপুলসংখ্যক ব্যবসাকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনা তথা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

লাখ লাখ ব্যবসায়ীকে লাইসেন্সের আওতায় আনার মতো সক্ষমতা রয়েছে কিনা সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বিদ্যমান অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এবং অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়বে। এতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও জটিল হবে। যদিও বিএফএসএর দাবি, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব এবং সে জন্য এই উদ্যোগ। নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে হবে। অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকবে না।

কী আছে আইনে
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর আওতায় নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে সরকার; গত ১৬ জুলাই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসায়ীদের শুধু নিবন্ধন নিতে হবে। যেমন– রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) বিএফএসএ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। এমনকি রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবারের ব্যবসায়ীদেরও নিবন্ধন করতে হবে।

অন্যদিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বা বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ব্যবসা, যেমন– শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি খাবার, ফর্টিফায়েড খাবার, অর্গানিক পণ্য, জিনগত পরিবর্তন করা খাবার এবং বিকিরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স নিতে হবে। বেসরকারি খাদ্যের গুদাম ও হিমাগারও লাইসেন্সের আওতায় আসবে। ভোজ্যতেলের পাইকারি বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত, আমদানি এবং বাজারজাতকরণে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও এই বিধিমালার আওতাভুক্ত হবেন।

বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং এরপর এটি নবায়ন করতে হবে। নিবন্ধনের ফি এক হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং নবায়নের খরচ হবে ৫০০ টাকা। খাবারের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করা হবে ফ্লোরের আকারের ওপর ভিত্তি করে। ছোট দোকানের জন্য এই ফি এক হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচ হাজার টাকা। খাদ্য মজুত করার ক্ষেত্রে ২০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় গুদামের লাইসেন্স নিতে দিতে হবে ৪০ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর মধ্যে হোটেল রেস্তোরাঁ ও চা-স্টলও আছে। ফাস্টফুডের দোকান আছে প্রায় ৬৭ হাজার। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে জানান খাত-সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার রেস্তোরাঁ আছে।

হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা
রাস্তার পাশের বিভিন্ন খাবারের দোকানগুলো ভাসমান, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষুধা নিবারণের ভরসাস্থল। নিবন্ধন না নিলে এসব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে কিনা, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে দুই দশক ধরে পরোটা বিক্রি করে সংসার চালান মাসুদ মিয়া। সমকালকে তিনি বলেন, কম পুঁজির ব্যবসা। এর মধ্যে নিবন্ধন নিতে হলে সীমিত লাভের ওপর হয়রানি ও বাড়তি চাঁদা বসবে। তাঁর মতে, কীভাবে নিবন্ধন নিতে হবে, কার কাছে যেতে হবে– এসবের কিছুই ছোট ব্যবসায়ীরা বুঝবে না। কারণ তাদের বেশির ভাগই কম শিক্ষিত বা অশিক্ষিত। নিবন্ধন না নিলে যদি দোকান বন্ধ হয়, তাহলে গরিব মানুষ কোথায় খাবে সেই প্রশ্ন তোলেন এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁগুলো বাজার থেকে যে কাঁচামাল কিনে আনে, তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে তা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু জরিমানা করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বা ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়।

লাইসেন্স নেওয়া বা না নেওয়া– উভয় ক্ষেত্রেই বিপদে পড়বেন ব্যবসায়ীরা এমন মন্তব্য করে ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁগুলোকে কমপ্লায়েন্সের (সব নিয়ম মেনে চলা) আওতায় আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।

ইমরান হাসান বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর বিজিএমইএ নিজেদের উদ্যোগে কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স করেছে। সরকার সহযোগিতা করলে পোশাক খাতের আদলে সমিতির নিজস্ব তদারকির মাধ্যমে রেস্তোরাঁ খাতকেও কমপ্লায়েন্সের আওতায় আনা সম্ভব। সমিতির পক্ষ থেকে ছাড়পত্র প্রদান এবং প্রাথমিক পর্যায়ের তদারকি করা হলে খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে বিএফএসএ এবং রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি যৌথভাবে কাজ করতে পারে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে ইমরান হাসান এই প্রক্রিয়ায় শুধু আমলাদের ওপর নির্ভর না করে ফুড কন্টামিনেশন, হাইজিন ও হ্যাজার্ড বোঝেন– এমন খাদ্য বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান।
স্বয়ংক্রিয় কিংবা হাতে তৈরি– সব ধরনের বেকারিও এই নীতিমালার আওতায় আসবে এবং তাদের লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ রুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া যদি সুশৃঙ্খল হয় এবং এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটে, তবে ব্যবসায়ীরা একে স্বাগত জানাবেন। কিন্তু লাইসেন্স করতে গিয়ে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হলে অর্থাৎ এক টাকার লাইসেন্সে ২৫ টাকা ব্যয় হলে সেটি হবে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বোঝা।

জালাল উদ্দিনের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি ছোট-বড় বেকারি রয়েছে, যেগুলোতে রুটি-পাউরুটি হাতে বানানো হয়। বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্যের কারণে এরা অনেকটা কোণঠাসা। এমন পরিস্থিতিতে লাইসেন্সিং ব্যবসায়ীদের জন্য হয়রানির কারণ হলে তারা আরও বিপদে পড়বেন। এতে সরকারের ভালো উদ্দেশ্যের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি দেখা দেবে।

এ ব্যাপারে টি.কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, একই ব্যবসার জন্য একাধিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বিধান কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনিতেই বিএসটিআইর লাইসেন্স বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। তার ওপর একই কাজের জন্য দুই-তিনটি অনুমোদন নেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
লাখো খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁ তদারকির আওতায় আনার সক্ষমতা বিএফএসএর আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তাঁর মতে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি-রপ্তানি নীতি রয়েছে। খাবারের মান নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশে বিএসটিআই রয়েছে। বিএফএসএ খাদ্যপণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের নতুন করে জটিলতা বাড়াবে।

ক্যাব সভাপতি বলেন, কর্তৃপক্ষের দাবি, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে হবে বলে কোনো হয়রানি হবে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পাসপোর্ট বা বিআরটিএর মতো সেবাগুলো অনলাইন হওয়ার পরেও মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে।

দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না দাবি বিএফএসএর
বিএফএসএর কর্মকর্তারা বলছেন, এটি সবার জন্য সরাসরি লাইসেন্স নয়। প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে এবং পরবর্তী ধাপে লাইসেন্স দেওয়া হবে। বিএসটিআইর সনদ যাদের রয়েছে তাদের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে আমদানি করা খাদ্যপণ্য ঠিক আছে কিনা, তা যাচাইয়ের জন্য বন্দরগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

হয়রানি ও ঘুষ-বাণিজ্যের আশঙ্কার বিষয়ে বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, হয়রানি কমাতে পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করার মেকানিজম করা হচ্ছে। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। নিবন্ধনের জন্য ফি অনেক কম হবে। তিনি বলেন, খাবার ব্যবসায়ীদের তালিকা বা ডেটাবেজ না থাকলে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাস্তার ধারের খাবারকেও নজরদারিতে আনা জরুরি, যাতে কেউ খাবারের সাথে ক্ষতিকর কিছু মিশিয়ে দিতে না পারে।

কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম বলেন, অনলাইন সিস্টেম চালু হলে প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। সারাদেশে প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার খাদ্য ব্যবসায়ীর ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে শেষ হতে পারে। এই তালিকায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ভাসমান বা সিজনাল স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের শনাক্ত করা কিছুটা কঠিন হলেও তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here