চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সরকারের রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে বড় উৎসে এমন পরিস্থতির জন্য ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতিকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতি থেকে সরে আগের মতো মাসিক রিটার্ন জমা ও কর পরিশোধের নিয়ম ফিরিয়ে আনতে পারে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সরকার ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। নতুন ত্রৈমাসিক নিয়মে মাঠপর্যায়ে কর নিরীক্ষণ বা মনিটরিং করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে ভ্যাট আদায় কমছে এবং রাজস্ব ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
আদায় কমেছে ২১ শতাংশ
এনবিআরের মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে ভ্যাট থেকে। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। গত জুলাই মাসে ৯ হাজার ৩০২ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় হয়েছিল, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্ট মাসে আদায় আরও কমে দাঁড়ায় আট হাজার ৩৬২ কোটি টাকায়, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকার ভ্যাট সংগৃহীত হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের আদায় হওয়া ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকার তুলনায় চার হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা কম।
সূত্র জানায়, আগের নিয়মে চালান কাটার আগেই চালানভিত্তিক ভ্যাট সরকারি ট্রেজারিতে জমা দিতে হতো। পরে নতুন নিয়মে ব্যবসায়ীদের ওই টাকা ৩০ দিন পর্যন্ত নিজের কাছে রেখে পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হতো। এখন তিন মাস সময় পাওয়ার কারণে বড় ব্যবসায়ীরা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাটের টাকা নিজের কাছে রেখে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে সুদ পাচ্ছেন কিংবা অন্য কাজে খাটাচ্ছেন। বিশেষ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধা পাচ্ছে। ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় হয় এনবিআরের অনুবিভাগ বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) মাধ্যমে। যার অধীনে রয়েছে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। তবে বড়রা সুযোগ পেলেও ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে এনবিআর। কর্মকর্তাদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একসঙ্গে তিন মাসের টাকা ট্রেজারিতে জমা দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ত্রৈমাসিক নিয়মের কারণে তদারকি ও রাজস্ব ঝুঁকি দুটিই বেড়েছে। আগে সার্কেল, বিভাগ ও ইউনিট ধরে প্রতি মাসে রাজস্ব তদারকি করা যেত, যা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সেজন্যই আগের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার জোর আলোচনা চলছে। আনুষঙ্গিক সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। এখন সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেখান থেকে সবুজ সংকেত এলে যে কোনো সময় নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
অবশ্য এনবিআরের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রথম দুই মাসের চিত্র দেখেই এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব না। কারণ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের ত্রৈমাসিক রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় রয়েছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ শেষে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
কী বলছেন ব্যবসায়ীরা
ব্যবসা-বাণিজ্যে তথা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন ব্যবসার জন্য কখনই শুভ নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও ব্যবসায়ী নেতা মো. ফজলুল হক সমকালকে বলেন, পুরোনো নিয়মে ফিরলে কিছু ব্যবসায়ীর লাভ হবে, কিছু ব্যবসায়ীর লোকসান হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নীতির পরিবর্তন। সরকারের একটা নীতি তিন মাসের মধ্যে পরিবর্তন করা ব্যবসার জন্য খুব ভালো ইঙ্গিত নয়। তবে সার্বিক প্রয়োজনে সরকার নীতি পরিবর্তন করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনই অর্থের প্রয়োজন হলে সে ক্ষেত্রে তিন মাসের পরিবর্তে মাসিক পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।
ভ্যাট নিতে এলে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ করতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। সমকালকে তিনি বলেন, এই শুভেচ্ছা মানে কী তা সবাই জানে। ব্যবসায়ীদের এখন ভ্যাট পরিশোধের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিন মাস পর শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হয়। আবার মাসিক ভিত্তিক চালু হলে প্রতি মাসেই শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হবে। অর্থাৎ খরচ বাড়বে। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনা গেলে বারবার নিয়ম পরিবর্তনের দরকার হয় না। এমনিতেই রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু কর্মকর্তাদের সেই সদিচ্ছা থাকা জরুরি।


