দ্রব্যমূল্য নিম্ন আয়ের ক্রেতার কাছে ডিমও এখন দামি দুই মাস ধরে ডিমের ডজন ১৫০, হালি ৫৫ টাকা

নিক ৬০০ টাকা মজুরি ভিত্তিতে রংমিস্ত্রির কাজ করেন। আয়-রুজি বলতে পরিবারে এটাই তাদের সম্বল। আক্ষেপ করে ওই গৃহিণী বলেন, ‘মাছ-মাংস কিনার কথা তো মাথাই আনি না। ডিম-সবজি খাই, কোনো রকম দিন পার করি। অহন ডিমের দামও বাড়ি (বেড়ে) গেল।’

বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে সাজুদা বেগমের মতো নিম্ন আয়ের যেসব ক্রেতা ডিমের ওপর ভরসা করতেন, তাদের অনেকের কাছেই এখন ডিম দামি হয়ে উঠছে। মাস চারেক আগে ডিমের ডজন কমে ১০০ থেকে ১১০ টাকায় নেমে এসেছিল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকে। গতকাল সমিতি বাজার, কারওয়ান বাজার ও নাখালপাড়া এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্মের সাদা রঙের প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। আর বাদামি রঙের প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা দরে। তবে পাড়া-মহল্লায় কেউ এক হালি কিনতে গেলে দোকানিরা ৫৫ টাকা দাম রাখেন; সে হিসাবে ডজনের দাম পড়ে ১৬৫ টাকা। দুই মাস ধরে ডিমের এমন উচ্চ দাম রয়েছে। এতে চাপ বাড়ছে কম আয়ের মানুষের সংসারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাম কমানোর কিংবা নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক মাসে ডিমের দর ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করে ডিমের দাম বাড়াচ্ছেন। তাদের অতি মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আমিষের অন্যতম এই উৎস।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিবছর এ সময় সবজির দাম বেশি থাকে। এ কারণে ডিমের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে দামও বাড়ে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, ডিমের বড় একটি অংশ সরবরাহ হয় টাঙ্গাইল থেকে। তবে বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকে ঢাকার ব্যবসায়ীদের হাত। তারা সারাদেশের ব্যবসায়ীদের কত টাকা দরে ডিম বিক্রি করবেন, তা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জানিয়ে দেন। ওই দরেই ডিম বেচাকেনা হয়।

কারওয়ান বাজারের খুচরা ডিম বিক্রেতা সাইফুল গাজী সমকালকে বলেন, পাইকাররা ডিমের দাম দুদিন কমান তো তিন দিন বাড়ান। এভাবে বাড়তে বাড়তে এখন দেড়শ টাকায় ঠেকছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অস্বাভাবিক বেড়েছিল ডিমের দাম। তখন ডজন ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছিল। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা নির্ধারণ করে দেয়, অর্থাৎ প্রতি ডজনের দাম ১৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এদিকে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও ডিমের দর বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হয়েছিল ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। ডজনে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়।

মধ্যবিত্তের বাজার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট। এই বাজারের পাইকারি সেলস সেন্টারের ব্যবসায়ী আহমেদ ফারুক বলেন, কিছুদিন ডিমের দাম স্থিতিশীল ছিল। মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় ডিমের দাম বাড়ছে। সরবরাহকারী ফার্মের মালিক, আড়তদাররা দাম বাড়ানোর কারণে খুচরায় এর প্রভাব পড়ছে। একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর আগ্রাবাদসংলগ্ন চৌমুহনী বাজারেও।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক পণ্য নিয়ে খেলছেন। তদারকির অভাবে অর্থলোভীদের এই নির্মম চক্র থেকে ভোক্তা রেহাই পাচ্ছে না। গরিবের পাত থেকে যারা ডিম কেড়ে নিতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৬০ হওয়ার পর দেশে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল এবং সরকার দাম নির্ধারণ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এখন তো সেই দামও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যারা তখন দাম বাড়িয়েছিল, তারাই আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।’

ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লাখ ডিম বেচাকেনা হয়। এসব ডিমের সিংহভাগই আসে বাইরে থেকে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, গত জুলাইয়ের বন্যায় ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ডিম দেওয়া লেয়ারজাতের মুরগির ফার্মও রয়েছে। এমনিতেই স্থানীয়ভাবে ডিমের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এর মধ্যে বন্যায় লেয়ার জাতের মুরগির ফার্মও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট আরও বাড়ে। দাম বৃদ্ধির জন্য এটিকেও একটি ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে সিন্ডিকেটের কারসাজিও রয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা সমকালকে বলেন, প্রতিদিনই আমরা বাজার তদারকি করি। ডিমের বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কিনা, সেটি আমরা খতিয়ে দেখব।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর