ব্যাংক খাতে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার লোকসান

0
5

ব্যাংক খাতের আর্থিক দুরবস্থার প্রভাব পড়েছে প্রধান সব সূচকের ওপর। কয়েকটি ব্যাংক ভালো মুনাফা করলেও তা যেন ধোপে টেকেনি। প্রথমবারের মতো পুরো খাতে বড় লোকসান হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট লোকসান এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালেও নিট মুনাফা ছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এর আগের বছরগুলোতে সব সময়ই পুরো খাতে মুনাফা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। এর মানে আমানতকারীদের যে পরিমাণ সুদ দেওয়া হয়েছে, সে তুলনায় ঋণ থেকে আয়ে পরিমাণ কম হয়েছে। আগের বছর ২৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার নিট সুদ আয় হয়েছিল। অবশ্য সুদবহির্ভূত আয় ২০২৪ সালের ৬৩ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকা হয়েছে। গত বছর বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৫১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা আগের বছর ৪৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ছিল। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের কর-পূর্ববর্তী লোকসান ছিল এক লাখ ২৪ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। আর নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।

আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে ব্যাংকভিত্তিক লাভ-লোকসানের তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে জাতীয় বাজেটের সঙ্গে সরকার প্রকাশিত ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও তথ্যাবলি’ বইয়ে প্রতিটি ব্যাংকের সব সূচকের তথ্য দেওয়া হয়েছে। সে অনুসারে নিট লোকসানের শীর্ষে থাকা ১০ ব্যাংক এক লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার লোকসান করেছে। এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো।

গত বছর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নিট ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। সোশ্যাল ইসলামী ৩১ হাজার কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯০৯ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। লোকসানে এর পরের অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের ৩ হাজার ৭০৬ কোটি, আইএফআইসির ২ হাজার ৫৬১ কোটি, ন্যাশনালের ২ হাজার ৪৩০ কোটি, প্রিমিয়ারের ৯৯৩ কোটি এবং পদ্মা ব্যাংকের ৯৩০ কোটি টাকা নিট লোকসান হয়েছে।

চরম দুরবস্থার মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক রেকর্ড মুনাফা করেছে। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি গত বছর এক হাজার ৫৮১ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক এক হাজার ৩০৬ কোটি, পূবালী ব্যাংক এক হাজার ৭৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ৯১০ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংক ৮৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে গত বছর ১৬টি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পেরেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, ব্যাংক খাতের দুরবস্থা কাটাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা সচলসহ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। সঠিকভাবে এসব ঋণ বিতরণ হলে ঋণ আদায় বেড়ে দ্রুত ব্যাংক খাতের পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা উপায়ে ঋণ নিয়মিত দেখানো হতো। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে আনতে শুরু করায় পুরো খাতের চিত্র সামনে এসেছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। বিশেষ পুনঃতপশিলের কারণে শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে গত ডিসেম্বরে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নামে। মোট ঋণের যা ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মূলত লুকানো খেলাপি ঋণ সামনে আনাসহ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ অনেক বেড়ে যাওয়ায় পুরো খাতের খারাপ অবস্থা সামনে এসেছে। গত বছর রেকর্ড এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়। এর পরও ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট ঋণের যা ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছর আগে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। ব্যাংকগুলোকে যেখানে মোট ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন রাখার কথা। গত বছর শেষে তা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। আগের বছর শেষেও প্রয়োজনের তুলনায় মূলধন অনেক কম ছিল। তবে তা ছিল ইতিবাচক ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। মূলত ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির প্রভাবে পুরো খাতে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

চরম দুরবস্থায় পড়া ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণার নিয়ম কঠোর করেছে। গত বছরের নির্দেশনার আলোকে ২০২৫ সালের জন্য কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে ওই ব্যাংক আর লভ্যাংশ দিতে পারেনি। আবার মূলধন কিংবা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংক যত মুনাফাই করুক, লভ্যাংশ দিতে দেওয়া হয়নি। এই নিয়মে এবার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। ২০২৬ সালের জন্য এসব নির্দেশনার পাশাপাশি নতুন দুটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এবার পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে ওই ব্যাংক ২০২৬ সালের জন্য নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here