হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আসা ছয় মাস বয়সী শিশু গৌরীকে জরুরি ভিত্তিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। তবে তৎক্ষণাৎ আইসিইউতে শয্যা মেলেনি। ২৬ শিশুর পেছনে অপেক্ষমাণ ছিল সে। ঠিকই সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে, তবে গৌরীর প্রাণ নেভার পর। গত শনিবার দুপুরে মৃত্যুর পরদিন গতকাল রোববার দুপুরে হাসপাতাল থেকে যখন আইসিইউ শয্যা খালি হওয়ার খবর জানাতে ফোন করা হয়, ততক্ষণে গৌরীর নিথর দেহ শ্মশানে।
গৌরী নাটোরের বাগাতিপাড়ার চাঁইপাড়া গ্রামের সোহাগ কুমার ও বন্দনা রানী দম্পতির প্রথম সন্তান। এ নিয়ে রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫২ শিশুর মৃত্যু হলো।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হামের উপসর্গ দেখা দিলে বাড়িতেই গৌরীর চিকিৎসা চলছিল। গত বুধবার অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাকে পুঠিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় রামেক হাসপাতালে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলে চিকিৎসক তাকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
গৌরীর বাবা সোহাগ কুমার বলেন, আইসিইউতে গিয়ে দেখি, সিরিয়াল পড়েছে ২৭ নম্বরে, অর্থাৎ গৌরীর আগে আরও ২৬ শিশু আইসিইউর জন্য মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষায় আছে। আইসিইউ না পেয়ে ওয়ার্ডেই তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছিল।
সোহাগ আরও জানান, শনিবার দুপুরে মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনি আবারও আইসিইউ বিভাগে ছুটে যান। কিন্তু সেখান থেকে জানানো হয়, সিরিয়ালের বাইরে তাদের করার কিছু নেই। এর কিছুক্ষণ পরই মারা যায় শিশুটি।
গতকাল দুপুরে যখন সোহাগের ফোনে আইসিইউ বিভাগ থেকে কল আসে, তখন পরিবারে চলছে মাতম। যিনি ফোন করেছেন, তাঁকে সোহাগ এটুকুই বলতে পেরেছেন, ‘আমাদের আর আইসিইউ লাগবে না। গৌরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোহাগ বলেন, আমার মেয়েটা তো চলে গেল, আর কারও সন্তান যেন এভাবে না যায়। আইসিইউ শয্যা বাড়ানো হোক। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি হামের রোগীর জন্য ও ছয়টি সাধারণ রোগীর জন্য। তবে রোগীর চেয়ে তা অপ্রতুল। আরও আইসিইউ শয্যার প্রয়োজন। নতুন একটি আইসিইউ ওয়ার্ড তৈরির জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। শয্যা ফাঁকা না থাকায় শিশুদের দীর্ঘ সিরিয়ালে থাকতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুর অবস্থাই সংকটাপন্ন থাকছে। ফলে আইসিইউর চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
হামের জরুরি টিকা
দেশে হামের প্রকোপ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আজ সোমবার থেকে সারাদেশে একযোগে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী ৩ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কর্মসূচি ১৩ দিন এগিয়ে আজ থেকে শুরু করছে সরকার।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) জানিয়েছে, তিন সপ্তাহের এই কর্মসূচির আওতায় ১১ কর্মদিবসে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। আজ প্রথম দিনেই ১১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সারাদেশে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫১০টি কেন্দ্রে এই কার্যক্রম চলবে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজারই অস্থায়ী কেন্দ্র। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এক ভিডিও বার্তায় এই কর্মসূচি সফল করতে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন।
সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এক দিনে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজন মারা গেছে। এ নিয়ে এ বছর উপসর্গসহ মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮১-তে। এর মধ্যে শুধু নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ৩৬ জন। গতকাল সকাল ৮টার আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৯৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬৫ জনের। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৫ হাজার ৩২৬ জন। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৪৪৩।
এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামে গত দুদিনে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নাসিরনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল বহির্বিভাগে ৫৭০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে ২০০-ই শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, পাঁচ থেকে সাত মাস বয়সী শিশুর আক্রান্তের হার বেশি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে মোট ১৪ শিশুর মৃত্যু হলো।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)




