রান্নার গ্যাসের বাজারে আবারও অস্বস্তি। সরকারি দরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু নগরের খুচরা বাজারে সেই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা বেশি পর্যন্ত ।
কোথাও কোথাও দাম উঠেছে ২ হাজার ২০০ টাকায়ও। বেশি দাম দিয়েও অনেক দোকানে মিলছে না সিলিন্ডার। ফলে আবাসিক পর্যায়ে ক্রেতাদের বাড়ছে ভোগান্তি ।
আমদানিকারকদের ভাষ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্তিতিতে দেশীয় পর্যায়ে আমদানি কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কার্গো পাওয়া কঠিন হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌপথে অস্থিরতায় বেড়েছে জাহাজভাড়া ও কার্গো প্রিমিয়াম । এর সঙ্গে পাইপলাইনের গ্যাস সংকটে এলপিজির চাহিদা বাড়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ।
বাড়তি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা
নগরের বাকলিয়া, কোতোয়ালি, চকবাজার, চান্দগাঁও এর বিভিন্নস্থানে ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে এলপিজির সরবরাহে কিছুটা টান রয়েছে। অনেক ডিলার সরবরাহ করছে না। যার ফলে একই ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হতে দেখা যায়। কোথাও দোকানে সিলিন্ডার আছে, কিন্তু দাম বেশি। আবার কোথাও দোকান খোলা থাকলেও বিক্রির মতো সিলিন্ডার নেই ।
বাকলিয়ার কালামিয়া বাজার এলাকার সিলিন্ডার ব্যবসায়ী মো. নাঈম উদ্দীন বলেন, ‘গত কয়েক দিনের মধ্যেই এলপিজির সরবরাহের পরিস্থিতি বদলে গেছে। ডিলারদের কাছ থেকে আগের মতো নিয়মিত সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দোকানে খালি সিলিন্ডার জমছে। যদিওবা নানা লবিংয়ে কোন কোম্পানির সরবরাহ পাওয়া যায়, আমাদেরকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সরকারের নির্ধারিত দরে ডিলাররা আমাদের এলপিজি সিলিন্ডার দিচ্ছে না। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে ক্রেতার ওপর।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকার ওপরে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি দরে কোথাও নেই, আমরা কিভাবে বিক্রি করবো?’
একই থানাধীন চাক্তাই এলাকার মদিনা এন্টারপ্রাইজ এর মালিক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ওমেরা, টোটাল, বিএম, আইগ্যাস ও ফ্রেশসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দাম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি । ব্র্যান্ডভেদে দামের পার্থক্যও রয়েছে। সরকারি দরে খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য না এলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছি না।’
এভাবে নগরের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার বাড়তি দরে বিক্রি করতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিজেন্সি গ্যাস হাউসের ডিলার মো. মহসিন বলেন, ‘গত এক সপ্তাহের মতো সময় ধরে নিয়মিত সিলিন্ডার সরবরাহ হচ্ছে না । ডিলার পর্যায়ে পণ্য না আসায় খুচরা পর্যায়ে প্রভাব পড়ছে । ফলে বাজারে শুধু দাম বাড়ছে না, কোথাও কোথাও পণ্যের উপস্থিতিই কমে যাচ্ছে।’
সরকারি দর কমেছে, বাজারে বেড়েছে
সিলিন্ডারের বাজার তদারকি করে জানা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটর কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির দাম বাড়ায়নি। বরং কমিয়েছে। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম আগস্টের ১ হাজার ৫৯৮ টাকা থেকে ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রতি কেজি দাম ধরা হয়েছে ১৩২ টাকা ১২ পয়সা। নতুন দর চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয় । কিন্তু সেই দরে নগরের কোথাও মিলছে না কোন সিলিন্ডার।
জানা যায়, বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস, পরিবহন ব্যয়, ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম ও ডলার বিনিময় হার বিবেচনা করে মাসিক মূল্য নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বরের জন্য সৌদি সিপির গড় মূল্য ছিল প্রতি টন ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। কিন্তু সরকারি দর আর বাজারদরের মধ্যে এখন ব্যবধান ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে প্রশ্ন উঠেছে – এই অতিরিক্ত টাকা কোথায় বাড়ছে?
–
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, সেপ্টেম্বরের বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে আমদানি করা পণ্য না পাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। অক্টোবরেও পর্যাপ্ত কার্গো নিশ্চিত করা না গেলে বাজারের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
আমদানি কমেছে ২৫ শতাংশ
তবে সংকটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর মধ্যে আমদানি কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন আমদানিকারকরা। আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত এসেছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। অর্থাৎ গত এক মাসের তুলনায় আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন বা ২৫ শতাংশ ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে আগস্টে ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছিল। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানিকারকের সংখ্যা ৯টিতে নেমেছে। ওই সময় পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টন।
এছাড়া দেশে এলপিজি খাতে ৫২টি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব বোতলজাতকরণ কারখানা আছে । ২৩টি প্রতিষ্ঠানের আমদানির সক্ষমতা থাকলেও নিয়মিত আমদানি করে মূলত ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান। ফলে কয়েকটি বড় আমদানিকারকের আমদানির ওপর বাজারের সরবরাহ অনেকটাই নির্ভরশীল।
কার্গো আছে, গ্যাস নেই
তবে সিলিন্ডারের সংকটের মূল কারণ হিসেবে একেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভাষ্য একক রকম। মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সায়েদ রাজা বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কার্গো পাওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য থাকলেও সেটি বাংলাদেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজ ও নিরাপদ রুট নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে এলপিজি আনার ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ রুট। সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই রুটগুলোতে বাধা তৈরি হওয়ায় বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে । এতে পথ দীর্ঘ হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ওমান, মালয়েশিয়া ও নরওয়ের মতো বিকল্প উৎস থেকে সীমিত পরিমাণে পণ্য আসছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আবু সায়েদ রাজার ভাষ্যমতে, আরেকটি বড় সমস্যা চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ। কিছু সরবরাহকারী চুক্তিতে থাকা পুরো পরিমাণ এলপিজি দিতে পারছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত মাসিক পরিমাণের প্রায় ২০ শতাংশ কম সরবরাহের কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ আমদানিকারক বেশি দাম দিতে রাজি থাকলেও সবসময় পণ্য নিশ্চিত করতে পারছেন না বলে জানান তিনি ।
প্রিমিয়াম ১৬০ থেকে ৪০০ ডলার
এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি, জাহাজ, বিমা, পরিবহন এবং কার্গো প্রিমিয়ামও বড় ব্যয় বেড়েছে বলে জানান এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এলওএবি) এর সদস্যরা। সংগঠনটির সদস্যদের দেয়া তথ্য মতে, আগে আমদানির হিসাবের মধ্যে প্রতি টনে প্রায় ১৬০ ডলারের প্রিমিয়াম ধরা হলেও এখন বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে।
কিছু আমদানিকারক চুক্তির তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পণ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন । বিইআরসির নির্ধারিত খুচরা মূল্য যদি আন্তর্জাতিক ব্যয়ের দ্রুত পরিবর্তনকে প্রতিফলিত না করে, তাহলে আমদানিকারকের সামনে দুটি পথ থাকে, বেশি দামে পণ্য এনে লোকসান দেওয়া, অথবা আমদানি কমিয়ে দেওয়া। আমদানি কমলে আবার বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়। সেই ঘাটতি খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ার চাপ তৈরি করে বলে জানান সংগঠনটির সদস্যরা।
বিএম এনার্জির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্যাপ্টেন মঈনুল আহসান খান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রেইট ব্যয় বিইআরসির হিসাবের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বেসরকারি এলপিজি আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ থাকলেও সরকারি পর্যায়ে এলএনজি আমদানির মতো এলপিজিতে সরাসরি ভর্তুকির সুযোগ নেই। অক্টোবরের জন্য কিছু এলপিজি সংগ্রহ করা গেলেও এতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।’
ওমেরা আনল ৩০ হাজার টন
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওমেরা পেট্রোলিয়াম সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজীম চৌধুরী জানান, ‘উৎপাদক পর্যায় থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য রাখার চেষ্টা করছে ওমেরা। সব প্রতিষ্ঠান একই হারে সরবরাহ সংকটে পড়েনি। কারও কাছে আমদানির পণ্য এসেছে, কারও ক্ষেত্রে চুক্তির পুরো পণ্য আসেনি। ফলে ডিলার পর্যায়ে ব্র্যান্ডভেদে সরবরাহের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।’
গ্যাস সংকট বাড়াচ্ছে এলপিজির চাহিদা
আগস্টেও শুরু থেকে নগরে কমেছে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ। যার ফলে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, কারখানা ও আবাসিক পর্যায়ে সংকটের প্রভাব দেখা গিয়েছিল। যা সরবরাহ সংকট সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও পুরোপুরি কেটে উঠেনি। এদিকে গ্যাসের চাপ কমলে রান্না, শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজন বাড়ে। এর একটি বড় অংশ পূরণ করছে এলপিজি।
তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। প্রায় ১ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ যায় রান্নার কাজে। ফলে সরবরাহে সংকট দেখা দিলে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বিইআরসি সদস্য মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘চলতি মাসে বেসরকারি উৎপাদকদের সরবরাহ প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টনে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার টন । অর্থাৎ উৎপাদন ও সরবরাহ একেবারে কমে গেছে, এমন নয়। কিন্তু পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের কারণে এলপিজির অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ায় বাজারে চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদকদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।’


