গ্যাসের বিকল্প হিসেবে গ্রামে বাড়ছে বায়োপ্লান্ট

0
3

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দিন দিন বাড়ছে। আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ। শিল্পকারখানায়ও মিলছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। চাহিদা মেটাতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। একই সময়ে এলপিজি গ্যাসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রামীণ জনপদে নীরবে গুরুত্ব বাড়ছে বায়োগ্যাসের। গবাদি পশুর গোবর ও জৈব বর্জ্য থেকে উৎপাদিত এই জ্বালানি শুধু রান্নার খরচ কমাচ্ছে না, একই সঙ্গে তৈরি করছে জৈব সার, কমাচ্ছে পরিবেশ দূষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ করছে নতুন সম্ভাবনা।

বগুড়া সেই সম্ভাবনার এক বড় উদাহরণ। সরকারি উদ্যোগে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় স্থাপিত শত শত বায়োগ্যাস প্লান্ট এখন অনেক পরিবারের রান্নাঘরের প্রধান জ্বালানির উৎস। যে গোবর একসময় ছিল অব্যবহৃত বর্জ্য, সেটিই এখন রান্নার গ্যাস, জৈব সার ও কৃষি উৎপাদনের সহায়ক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে বগুড়ার ১২ উপজেলায় ৩৯৩টি বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু রয়েছে। এসব প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৬১ হাজার ৯৬০ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদিত হচ্ছে ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার এবং ১৫ হাজার ৩০০ কেজি বায়ো-কেমিক্যাল। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৬৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, ঋণ বিতরণ করা হয়েছে পাঁচ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে বায়োগ্যাস প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প নয়। তবে গ্রামীণ পরিবারের রান্নার জ্বালানির চাহিদা পূরণে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে এলপিজির ওপর নির্ভরতা কমবে, একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরও চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় গবাদি পশু পালন বেশি, সেখানে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি বিস্তারের সুযোগও বেশি।

বগুড়ায় এখন পর্যন্ত তিনটি বায়োগ্যাস পল্লি গড়ে উঠেছে। ধুনটের পাঁচথুপী ও গোসাইবাড়ী এবং গাবতলীর জামিরবাড়িয়া গ্রামের এসব পল্লিতে প্রযুক্তিটির সুফল মিলছে সরাসরি। জামিরবাড়িয়া গ্রামের ৩৬টি পরিবার নিজেদের গরুর গোবর ব্যবহার করে প্রতিদিন রান্নার গ্যাস উৎপাদন করছে। একই সঙ্গে প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার ব্যবহার হচ্ছে কৃষিজমিতে। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমছে।

জামিরবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ শিমু বেগম বলেন, ‘আগে প্রতিদিন রান্নার জন্য কাঠ ও খড় সংগ্রহ করতে হতো। এখন বায়োগ্যাস ব্যবহার করায় রান্না সহজ হয়েছে।’ একই গ্রামের উদ্যোক্তা সাথী খাতুন বলেন, আগে গরুর গোবরের তেমন কোনো ব্যবহার ছিল না। এখন সেই গোবর থেকেই গ্যাস তৈরি হচ্ছে। প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলনও মিলছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক সেলিম উদ্দিন বলেন, বায়োগ্যাস প্রকল্পকে শুধু একটি জ্বালানি কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি উৎপাদন এবং আত্মকর্মসংস্থানের একটি সমন্বিত উদ্যোগ।

বায়োগ্যাস প্লান্টে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ গোবর ও পানি ডাইজেস্টারে প্রবেশ করানো হয়। বায়ুশূন্য পরিবেশে জৈব বর্জ্য পচে মিথেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি হয়। সেই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি রান্নাঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ভালভের সাহায্যে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই গ্যাস ব্যবহার করে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান কিংবা অন্যান্য ছোট যন্ত্রও চালানো সম্ভব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে চাহিদা বাড়ছে। সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখা হয়তো বায়োগ্যাসের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে গ্রামীণ পর্যায়ে রান্নার জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশের চাহিদা পূরণে এটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

কৃষি বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে অনেক জমির জৈবগুণ কমে যাচ্ছে। বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, অণুজীবের কার্যক্রম সক্রিয় থাকে এবং উৎপাদন ব্যয়ও কমে। পাশাপাশি গোবর খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে যে দুর্গন্ধ, মাছি-মশার উপদ্রব ও পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি হয়, বায়োগ্যাস প্রযুক্তি সেই সমস্যাও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার বায়োগ্যাস প্লান্টগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ ঘনফুট কার্বন নির্গমন কমাতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার, যা কৃষিতে জৈব উপাদান ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখছে।

তবে এই সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বিস্তারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পর্যাপ্ত গবাদি পশু না থাকলে প্লান্ট থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায় না। নিয়মিত গোবর সরবরাহ, কারিগরি জ্ঞান এবং সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে একদিকে পরিবারের জ্বালানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরিত হয়ে কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, বায়োগ্যাস প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here