নকল মুখ, মেকি কণ্ঠে প্রতারণার নতুন ফাঁদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে সেনাবাহিনীর নারী সদস্যের ভুয়া ছবি তৈরি করেন তোফায়েল আলম টিটু নামে এক যুবক। বাহিনীর পোশাক পরা ছবিটি ব্যবহার করে তিনি ‘লেডি সোলজার’ নামে ফেসবুক পেজ খোলেন। সেই ভুয়া পরিচয়ে ইতালিপ্রবাসী এক তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়েন তিনি। কৌশলে হাতিয়ে নেন প্রায় সাত লাখ টাকা। প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর এ ঘটনায় মামলা হয়। তদন্তে নেমে সম্প্রতি অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা আধুনিক জালিয়াতির জাল বুনছে। ভুয়া পরিচয়, নকল কণ্ঠ ও মুখাবয়ব তৈরি থেকে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, সেক্সটর্শন বা আর্থিক প্রতারণা– নানা অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে এ প্রযুক্তি। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের এই বছরের দুটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও সাইবার অপরাধের পরিবর্তনশীল এই চিত্র উঠে এসেছে।

গত ১৭ জুন প্রকাশিত এশিয়া অ্যান্ড সাউথ প্যাসিফিক সাইবার থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাইবার অপরাধের চিত্র তুলে ধরে ইন্টারপোল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি দেশ জানিয়েছে, তাদের নথিভুক্ত অপরাধের অন্তত ৩০ শতাংশ সাইবার অপরাধ। ৩৩ শতাংশ দেশ ১০ হাজারের বেশি অনলাইন স্ক্যামের কথা জানিয়েছে। এই প্রতিবেদনের তথ্যের সময়কাল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত।

ইন্টারপোল আরও জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাইবার অপরাধীদের ব্যবহৃত ফোরাম ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে ডিপফেক নিয়ে আলোচনা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ৬০০ শতাংশ বেড়েছিল। এআই ব্যবহার করে আরও বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং বার্তা, ভুয়া পরিচয় এবং বাস্তবসম্মত ডিপফেক তৈরির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতারণাবিষয়ক নোটিশ বেড়েছে ৫৪ শতাংশ
ইন্টারপোল গত ১৬ মার্চ ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট ২০২৬’ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে আর্থিক প্রতারণাবিষয়ক ‘নোটিশ ও ডিফিউশন’ ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। নোটিশ ও ডিফিউশনের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সদস্য দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো অপরাধবিষয়ক তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতার অনুরোধ করে।

ওই প্রতিবেদনে এআইনির্ভর প্রতারণাকে দ্রুত বিকাশমান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এআইনির্ভর প্রতারণা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে সাড়ে চার গুণ লাভজনক হতে পারে। এ হিসাবটি ব্লকচেইন ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘চেইন্যালাইসিস’-এর উদ্ধৃত তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।

আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় বা সেক্সটর্শনও বৃহত্তর অনলাইন প্রতারণা কাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অপরাধে এআই নির্মিত কনটেন্ট ব্যবহার হচ্ছে।

বাংলাদেশে এআইয়ের অপব্যবহার
আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মিল পাওয়া যাচ্ছে। এআই দিয়ে ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল, পরিচিত ব্যক্তির মুখ ও কণ্ঠ নকল করে বাণিজ্যিক প্রতারণা এবং ভুয়া পরিচয় তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে সাবেক স্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে এআই দিয়ে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গত ১১ সেপ্টেম্বর এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, ওই যুবক কনটেন্ট দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা না দেওয়ায় তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এর আগে মিজানুর রহমান আজহারীর ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করে এআই ও ডিপফেক ভিডিও তৈরির একটি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভুক্তভোগী এ বিষয়ে পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ২৩ এপ্রিল মামলা করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যম থেকে তাঁর ছবি ও কণ্ঠস্বর সংগ্রহ করে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হয়। এসব ভিডিও ব্যবহার করে যৌন উত্তেজক ওষুধের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তদন্তে ২৪টির বেশি ভুয়া ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইট ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে।

এআই প্রযুক্তিকে বিশ্বাসযোগ্যতার উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করছে প্রতারকরা। গত ১৬ জুন সিআইডি জানায়, প্রতারক চক্র এআইভিত্তিক ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে। এভাবে সাত লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আন্তর্জাতিক অভিযানে বাংলাদেশ সাইবার অপরাধবিরোধী আন্তর্জাতিক অভিযানে অংশ নেয় বাংলাদেশ। গত ১৩ মার্চ প্রকাশিত ‘অপারেশন সিনার্জিয়া-৩’-এর ফলাফলে ইন্টারপোল জানায়, ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই থেকে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭২টি দেশ ও অঞ্চলে অভিযানটি চালানো হয়। বাংলাদেশে তখন ৪০ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১৩৪টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়।

এর পর গত ৯ জুলাই প্রকাশিত ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট ২০২৬’-এর ফলাফলে ইন্টারপোল জানায়, ১৫ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ৯৭ দেশ ও অঞ্চলে চালানো অভিযানে পাঁচ হাজার ৮১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় বিশ্বজুড়ে এক লাখ ৪২ হাজারের বেশি ভুক্তভোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তর যা বলছে
এআইয়ের অপব্যবহারে বদলে যাওয়া সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ কীভাবে কাজ করছে– জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখা একটি লিখিত বক্তব্য দেয়। তারা বলছে, সাইবার অপরাধ ও ডিপফেকবিষয়ক অপরাধের তদন্ত, শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে ডিএমপি, সিআইডিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট আলাদাভাবে কাজ করে। তবে সম্প্রতি এসব অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের একটি বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। আশা করা যায়, ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করলে সমন্বিত উদ্যোগ, বিশেষায়িত দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ ও ডিপফেকবিষয়ক অপরাধ দমন আরও সহজ হবে।

‘বাস্তবায়নযোগ্য সদিচ্ছা থাকা দরকার’
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আমাদের দেশে প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। আবার দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করেন, তাদের চেয়ে অপরাধীরা বেশি দক্ষ। আমাদের সক্ষমতা সেই পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে না। আর সাইবার সুরক্ষা আইন হলেও অপরাধ যথাযথভাবে শনাক্ত করে আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বাস্তবায়নযোগ্য সদিচ্ছা থাকা দরকার।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এআই নেটওয়ার্কিং থাকা দরকার। এতে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা সমাধানের কার্যকর উপায় বের করা সহজ হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর