নিবন্ধন না হওয়ায় দুই বছরে উপবৃত্তি বঞ্চিত ২৬৭ শিক্ষার্থী টুঙ্গিপাড়ার গোপালপুর পঞ্চপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়

0
7

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর গ্রামটি বিলবেষ্টিত। এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই শ্রমজীবী। কেউ কাজ করেন ক্ষেত-খামারে, কেউ খাল-বিলে ধরেন মাছ। দৈনিক ভিত্তিতে শ্রম বিক্রি করেন কেউ। কেউ আবার ভ্যান চালান।

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিদ্যালয়ে পাঠান সন্তানদের। এসব শিশু-কিশোরের প্রধান ভরসা গোপালপুর পঞ্চপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলায় দুই বছরে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট্রের সমন্ধিত উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে ২৬৭ শিক্ষার্থী। খরচ চালাতে না পেরে তারা ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

অভিভাবকরা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট্রের সমন্ধিত উপবৃত্তির টাকা পেলে দরিদ্র পরিবারের কিশোর-কিশোরীরা এসএসসির গণ্ডি পার হওয়ার সাহস পায়। উপবৃত্তি পাওয়ার জন্য ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নিবন্ধন করতে হয়। বিদ্যালয় থেকেই নিবন্ধন করে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ষষ্ঠ শ্রেণির ১২১ শিক্ষার্থীর নিবন্ধন করা হয়নি। ২০২৫ সালেও নিবন্ধন করা হয়নি ষষ্ঠ শ্রেণির ১৪৬ শিক্ষার্থীর। এ কারণে মোট ২৬৭ শিক্ষার্থীর দশম শ্রেণি পর্যন্ত উপবৃত্তি পাবে না। একই কারণে তারা এসএসসির ফরম পূরণের সময়ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের এক হাজার টাকা থেকেও বঞ্চিত হবে।

চলতি বছরই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণে তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। এই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র দেবরাজ মহলীর মা ঝর্ণা মহলী বলেন, ‘অন্য স্কুলের ছাত্ররা টাকা পায়, কিন্তু আমার ছেলে পায় না। মাস্টাররা যে কাগজ চেয়েছেন, দিয়েছি। তারপরও উপবৃত্তির টাকা পায় না। এটা তাদের ভুল। আমরা গরিব মানুষ, সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তারপরও স্কুলের খরচ আছে। টাকাটা পেলে কষ্ট কম হতো।’
গত বছর নিবন্ধন করা হয়নি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র স্বপন তালুকদারের। শিশুটি জানায়, ‘গত বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এখন পর্যন্ত উপবৃত্তির টাকা পাই নাই। আর পাওয়ার সম্ভাবনাও নাই বলে শুনেছি।’ ওই টাকা পেলে তার কৃষিজীবী বাবার কষ্ট কম হতো।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী পর্শী তালুকদারের বাবাকে সংসার খরচের জন্য ভ্যান চালাতে হয়। সে জানায়, ‘বাবা আমাদের পড়ানোর টাকা দিতে পারেন না। আমরা উপবৃত্তি পাই না। তারপর টিউশন ফি, পরীক্ষা ও রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়ানো হয়েছে।’ এতে দরিদ্র এই গ্রামের শিশুদের পড়াশোনা বন্ধের মুখে পড়েছে বলেও জানায় সে।

এখানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে শান্তি ব্যাপারীর ছেলে শ্যামল ব্যাপারী। শ্যামলের নামও নিবন্ধন করা হয়নি জানিয়ে শান্তি ব্যাপারী বলেন, ২০২৬ ও ২০২৫ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ২৬৭ শিক্ষার্থী উপবৃত্তির রেজিস্ট্রেশন থেকে বাদ পড়েছে। এই উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন তারা আর উপবৃত্তি পাবে না। প্রত্যেক শিক্ষার্থী পাঁচ বছরে ১৬ হাজার টাকার উপবৃত্তি পেত, সেই টাকা থেকে বঞ্চিত হলো। সব মিলিয়ে ৪২ লাখ ৭২ হাজার টাকার উপবৃত্তি পাবে না এই শিশুরা।

তাঁর অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিল্টন তালুকদার বিদ্যালয়ের টাকা লুটপাট, ভিলেজ পলিটিক্সসহ নানা অপকর্মে জড়িত। বিদ্যালয়ের কাজ নিয়ে গাফিলতি করেন। তাই এমন ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সম্প্রতি মাসিক টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি বাড়ানো হয়েছে। ছেলেমেয়েকে পড়াতে গিয়ে খরচের হিসাব মেলাতে পারছেন না। দ্রুত এটির প্রতিকার দাবি করেন তিনি।

একই অভিযোগ তুলে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা মহলীর বাবা অধীর মহলী বলেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক মিল্টন তালুকদার দুই বছর আগে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। তারপর থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। এ জন্য শিক্ষা কার্যক্রম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি সব সময় দলাদলিতে ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষা ও শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট কাজ করেন না।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিল্টন তালুকদারের ভাষ্য, তাঁর বিদ্যালয়টি দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পেলে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে উপকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারাও শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা করেন, বেতন-ফি কম নেন। তিনি দাবি করেন, গত বছর শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আবেদন করা হলেও সার্ভারের ত্রুটিসহ নানা কারণে তারা উপবৃত্তি পায়নি। এর পরও অনেক শিক্ষার্থীর ফি কম নিয়েছেন। এ বছর সময়মতো ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করা যায়নি।

তিনি একাধিকবার শিক্ষা বোর্ডে গিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। অবশেষে গত মাসে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। তাদের বলা হয়েছিল, রেজিস্ট্রেশন হলে উপবৃত্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তারা বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ ও আলোচনা করছেন।

তিনি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি নিয়ে জটিলতার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরার অনুরোধ করেন। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, এসব অস্বীকার করেন মিল্টন তালুকদার।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম তালুকদার বলেন, ২০২৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির জন্য আবেদন করতে জানুয়ারি মাস থেকেই বিভিন্ন নির্দেশনা ও চিঠিপত্র পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার ফোনেও যোগাযোগ করা হয়েছে। গত জুন মাসে চূড়ান্তভাবে আবেদন জমা দেওয়ার সময়ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে জানানো হয়েছিল যে, তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তথ্য এখনও এন্ট্রি করা হয়নি। তখন বোর্ডে দ্রুত যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কার্যকর উদ্যোগ নেননি।

শিক্ষা কর্মকর্তার ভাষ্য, যেহেতু উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ও নির্ধারিত সময়ে তথ্য এন্ট্রি করতে হয়, তাই এবার আর তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। পরের বছরেও এই শিক্ষার্থীরা ষষ্ঠ শ্রেণির উপবৃত্তির আবেদন করতে পারবে না। তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সময়। এ বিষয়ে একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি বারবার বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার কথা বললেও কেন সম্পন্ন করা যায়নি, সে বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

টুঙ্গিপাড়ার ইউএনও জহিরুল আলম বলেন, গোপালপুর পঞ্চপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে অভিযোগের বিষয়ে শুনেছেন। শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানার পর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে তুলনামূলক ফি বেশি নেওয়া হচ্ছে, যৌক্তিক পর্যায়ে ফি কমানোর চেষ্টা করবেন। তাঁর ভাষ্য, এ বছরের উপবৃত্তির সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় বঞ্চিতদের জন্য কিছু করার নেই। আগামী বছর যেন তারা সময়মতো উপবৃত্তি পায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জেলা পরিষদ থেকে আর্থিক সহায়তার সুযোগ থাকলে সেই ব্যবস্থার আশ্বাস দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here