চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ইপিজেড থানার পিস্তল লুট করেও তদন্তের ফাঁকফোকরে বেঁচে গেছেন মূল অভিযুক্ত মো. সবুজ। আর লুটের পিস্তল সবুজের কাছ থেকে এনে নিজেদের কাছে রেখে ফেঁসে গেলেন নাহিদ হাসান মানিক ও মো. কামাল। তারা দুজন সবুজের গ্রামের বাড়ি, চট্টগ্রাম শহরে ঠিকানা এবং মোবাইল ফোন নম্বরের তথ্য দিলেও ডিবি পুলিশ খুঁজেই পায়নি সবুজকে!
দায়সারা তদন্ত করে পিস্তল জমা রাখা মানিক-কামালকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। সঠিক নাম-ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি– এমন অজুহাতে মূলহোতা সবুজকে তদন্তের বাইরে রাখা হয়।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অগ্নিসংযোগের মধ্যে ইপিজেড থানা থেকে পুলিশের বিদেশি পিস্তল লুট করেন মো. সবুজ। লুটের পিস্তলটি মানিক নামে এক বন্ধুর কাছে জমা রাখেন তিনি। মানিক কিছুদিন সেটি নিজের হেফাজতে রাখেন। নিষ্ক্রিয় পুলিশ সক্রিয় হতেই পিস্তলটি একটি মিউজিক বক্সে করে বাগেরহাটের মোংলায় তার ভাই মো. কামালের কাছে রেখে আসেন। কামাল তিন দিন পর মিউজিক বক্সটি খুলে দেখেন সেখানে পিস্তল। ফোন করেন চট্টগ্রামের মানিককে। পিস্তলটি কয়েকটি দিন রাখার অনুরোধ করে শিগগির নিয়ে যাবেন বলে জানান মানিক। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের জালে ধরা পড়েন মানিক। তার দেওয়া তথ্যে বাগেরহাট থেকে কামালের ঘরের আলমারি থেকে উদ্ধার করা হয় চট্টগ্রামের থানা লুটের বিদেশি চায়না পিস্তলটি। তবে পুলিশ তদন্তে নেমে বরিশালের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা সবুজকে ধরতে ব্যর্থ হন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মো. কামরুল হুদা বলেন, সবুজের চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামের ঠিকানা দিলেও সুনির্দিষ্টভাবে তার অবস্থানের তথ্য দুই আসামি দিতে পারেননি। শহরের র্যাব-৭ গলিতে খোঁজ নিলেও এ নামে কাউকে পাওয়া যায়নি। বরিশালে খোঁজ নিয়েও এ নামে কাউকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া অস্ত্র মামলায় ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় দ্রুত প্রতিবেদন দিতে হয়েছে।
আইনজীবী জাফর ইকবাল বলেন, থানা লুটের বিষয়টি স্পর্শকাতর ঘটনা। সবুজ নামে যে ব্যক্তি থানা থেকে পিস্তল লুট করল, সে যদি তদন্তের বাইরে থেকে যায়, তাহলে এটি তদন্তের বড় ত্রুটি। মূল অপরাধী তদন্তের বাইরে থেকে যাওয়া তদন্তের বড় দুর্বলতাও। মামলাটি একজন দক্ষ কর্মকর্তা দিয়ে অধিকতর তদন্ত করা উচিত।
থানা লুটে অংশ নেওয়া তিন দুর্বৃত্তই অধরা
৫ আগস্ট ইপিজেড থানা থেকে অর্ধশত অস্ত্র লুট করে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে এই অস্ত্র মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তিন দুর্বৃত্তের নাম উঠে আসে। তারা হলেন– সবুজ, ইব্রাহীম ও মমিন। তদন্তে তাদের নাম এলেও অধরা থেকে যান তারা। পুলিশ সবুজের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মঠবাড়িয়া ও চট্টগ্রাম শহরের র্যাব-৭ গলির ঠিকানা পেলেও তার হদিস পায়নি। তবে মানিকের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে সবুজ, ইব্রাহীম ও মমিনকে শনাক্ত করা খুব জটিল কাজ ছিল না বলে মনে করেন অপরাধবিষয়ক মামলা পরিচালনা করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চৌধুরী আবদুল্লাহ।
দুই আসামি জবানবন্দিতে যা বললেন
চট্টগ্রাম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নাহিদ হাসান মানিক উল্লেখ করেন, ‘৫ আগস্ট ঘটনার দিন আমরা চার বন্ধু ইপিজেড থানার সামনে আসি। অন্যদের নাম সবুজ, ইব্রাহীম ও মমিন। আমি আঘাত পেয়ে বাসায় ফিরে যাই। ঘটনার দুদিন পরে সবুজ আমাকে একটি পিস্তল রাখার জন্য দেয়। পরে জানতে পারি ইপিজেড থানা থেকে পিস্তলটি এনেছে। সবুজ নগরের স্টিল মিল র্যাব-৭ গলির ভেতরে ভাড়া বাসায় থাকে। পিস্তলটি পাঁচ মাস আমার বাসায় রাখি। পরে আমার নিরাপত্তার জন্য পিস্তটি মিউজিক বক্সের ভেতরে করে মোংলায় আমার এক ভাইয়ের কাছে রেখে আসি। পরে ডিবি মোংলার চাঁদপাই গিয়ে কামালের বাসা থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করে।’
আরেক আসামি কামাল জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ‘আমি জাহাজের শ্রমিক। চার মাস আগে মানিক চট্টগ্রাম থেকে একটি মিউজিক বক্স এনে আমাকে দেয়। তিন দিন পর বক্স খুলে দেখি ভিতরে পিস্তল। বিষয়টি আমি মানিককে বললে সে আমাকে বলে, সময়মতো পিস্তলটি নিয়ে যাবে। পরে আমি পিস্তলটি মিউজিক বক্স থেকে খুলে কাঠের আলমারিতে রাখি।’
পিস্তল লুটকারী তদন্তের বাইরে
দায়সারাভাবে তদন্ত শেষ করে মানিক ও কামালকে অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সবুজের সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে তাকে তদন্তের বাইরে রেখে দেয়। ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিনিয়র স্পেশান জজ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা হয়। যদিও পুলিশের অস্ত্র লুটের মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পুলিশের দায়সারা তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীরীরা।



