ফসলডুবির পর ঋণের চক্রে হাওরের কৃষক

0
4

কিশোরগঞ্জ সদর থেকে নিকলী হাওরের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। সদর থেকে এক-দেড় ঘণ্টায় নিকলী বেড়িবাঁধে পৌঁছে গেলাম। বেড়িবাঁধ পেরিয়ে নৌকায় উঠতেই চারপাশে দিগন্তজোড়া জলরাশি। মাঝেমধ্যে মাথা তুলে থাকা গাছ, আর কোথাও কোথাও ডুবে থাকা ফসলের ক্ষতচিহ্ন। এই জলরাশির নিচেই চাপা পড়ে আছে হাজারো কৃষকের এক মৌসুমের ঘামে অর্জিত সম্পদ।

হাওরপারে দেখা হয় হাজেরা খাতুনের সঙ্গে। চুপচাপ বসে ছিলেন তাঁর ডুবে যাওয়া জমির পাশে। কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে। প্রায় ১০ বিঘা জমিতে পাকা ধান ছিল তাঁর। ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। ইচ্ছে ছিল, ধান ঘরে তুলে ঋণ শোধ করবেন। সন্তানদের নিয়ে কোরবানির ঈদ ভালোভাবে উদযাপন করবেন। কিন্তু সব স্বপ্ন ভেসে গেছে পানিতে।

ধান তলিয়ে যাওয়ার শোক সামলে নিয়ে হতাশাভরা কণ্ঠে হাজেরা খাতুন বলেন, ‘বন্যায় আমাদের গ্রামের সবার ধান গেছে। কারও দুই আনা ধানও টেকেনি। নিজেদের খাওয়ার ধান নাই; গবাদি পশুর খাবার খড়ও নাই। আর যদি দুই সপ্তাহ পরও বন্যার পানি ঢুকত, তাহলে খাওয়ার মতো কিছু ধান অন্তত ঘরে তুলতে পারতাম।’ এ আফসোস হাজেরা খাতুনের নয়; কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকের। সবারই প্রায় হাজেরা খাতুনের মতো অবস্থা।

দেখা গেছে, কোথাও পাকা ধান পানির নিচে, কোথাও কাটা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। ফসল হারিয়ে সবাই ভেঙে পড়েছেন। দিন যত যাচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়ছে। আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

হাওরের কৃষি এমনই– এক মৌসুমের ধানের ওপর নির্ভর করেই চলতে হয় পুরো বছর। বোরো ধান ওঠা মানেই ঘরে চাল, ঋণ শোধ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা– সবকিছুর জোগান। সেই ধানই যদি হাতছাড়া হয়, তাহলে কৃষকের জীবনে শুরু হয় এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।

নিকলীর মোহরকোনা গ্রামের কৃষক রণজিৎ চন্দ্র দাস বলেন, ‘কিছু ধান ঘরে তুলেছিলাম। এখন সেগুলো পচে গন্ধ করছে। মাঠের ধান তো গেলই, ঘরের ধানও বাঁচল না।’
হাওরের কৃষকের জীবন বোঝাতে গিয়ে স্থানীয় পরিবেশকর্মী আবদুর রহমান বলেন, হাওরে ঋণ ব্যবস্থা একটু ভিন্ন। এখানে খুব কম কৃষকই নিজের পুঁজিতে চাষ করতে পারেন। মৌসুম শুরুর আগে তাদের দরকার হয় নগদ টাকা। এই টাকার উৎস দুই ধরনের হয়ে থাকে– ব্যাংক বা এনজিও আর স্থানীয় মহাজন বা দাদনদার। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ব্যাংকের ঋণ পাওয়া কঠিন। কাগজপত্র, জামানত জোগাড় করা সহজ নয়। ফলে তারা ভরসা করেন মহাজনের ওপর। ফসল উঠলে নির্দিষ্ট দরে ধান দিয়ে ঋণ শোধ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে কম দামে। এবার সেই ব্যবস্থাটাই উল্টো ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিকলীর শাহপুর গ্রামের কৃষক মাহফুজ মিয়া ২০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সব। ঋণ নিয়েছিলেন স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে। কীভাবে শোধ করবেন এত টাকা, সেই চিন্তায় ঘুম হয় না তাঁর।

মুছা মিয়া নামে আরেকজন বলেন, ‘সবাই ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেন। ব্র্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক– এমন প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অনেকে সমিতি বা মহাজনের কাছ থেকেও ঋণ নেন। ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ কৃষক জমি, গরু বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন। তারপর সামনের বছর আবার ঋণ করে চাষ করবেন। এভাবে ঋণের চক্র চলতেই থাকবে।’
কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে কোনোমতে কিছু ধান নৌকায় তুলছিলেন আবু তাহের। দৈনিক এক হাজার ২০০ টাকায় দিনমজুর নিয়েছেন তিনি। অথচ ভেজা ধান ৬০০ টাকা মণ। ক্ষতি জেনেও মায়ায় পড়ে কিছু ধান তোলার চেষ্টা করছিলেন। জানালেন, ধান চাষের জন্য তিনি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আবু তাহের বললেন, ‘এখন ঘরে যে ধান আছে, তা দিয়ে পরিবারের খাবারই জুটবে না। ওদিকে পাওনাদার (মহাজন) টাকা শোধের জন্য জমি বিক্রি করার চাপ দিচ্ছে। জমি বিক্রি করা ছাড়া আমার আর কোনো পথ খোলা নেই।’

মিঠামইন উপজেলার খাসাপুর গ্রামের কৃষক রতন মিয়া বলেন, বন্যায় পুরো হাওরে ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সব সহায়তা যাচ্ছে সুনামগঞ্জে। কিশোরগঞ্জে এখনও সহায়তা শুরু হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, কিশোরগঞ্জে ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর ধানক্ষেত  তলিয়ে গেছে। এতে ৫২ হাজার ৫০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের জন্য জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু হবে এবং তা পরবর্তী তিন মাস পর্যন্ত চলবে।

২০২৭ সালে বোরো মৌসুমে আগাম বন্যায় কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার ফসল বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ২০২২ সালেও ফসলডুবির ঘটনা ঘটে। পরের দুই বছর ফলন ভালো হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি কৃষক। তারা এলাকার মহাজন, বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে একের পর এক ঋণ নিয়েছেন। সেই ঋণের জাল থেকে বের হতে পারেননি হাওরবেষ্টিত উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী ও করিমগঞ্জের কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে, তিন বছর আগে ২০১৬-১৭ মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নষ্ট হয় ৫৫ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমির প্রায় তিন লাখ টন ধান। ক্ষতিগ্রস্ত হন এক লাখের বেশি কৃষক। এর পরের দুই মৌসুমে উৎপাদন ভালো হলেও কৃষক বলছেন, তারা ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি। ফলে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেননি। এই অবস্থায় মহাজনদের থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে অনেকে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। সেই ঋণ শোধ করতে ঋণ নিয়েছেন ব্যাংক থেকে। এভাবে ঋণের চক্রে পড়েছেন তারা।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, এই বিপর্যয় পুরোপুরি প্রাকৃতিক নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের পথ পলি জমে বন্ধ হয়ে যাওয়া, অকেজো স্লুইসগেটের কারণে পানি নামার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে স্বল্প সময়ের বৃষ্টিও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সময়মতো ধান কাটতে না পারার সমস্যা। ডিজেল সংকট, শ্রমিকের অভাব, যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা– সব মিলিয়ে কৃষকেরা প্রস্তুত থাকলেও ফসল তুলতে পারেননি। অনেক জায়গায় জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার ব্যবহার করা যায়নি। অন্য বছর দূরদূরান্ত থেকে শ্রমিক এলেও এবার সেই প্রবাহ কম ছিল।

তিনি বলেন, এই ক্ষতি এখানেই শেষ নয়। কৃষকের হাতে এখন কোনো পুঁজি নেই। ফলে পরের মৌসুমে চাষ করাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, একটি বিশেষ কার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে তিন মাস কৃষককে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো ফসলহানির পর কৃষকেরা কীভাবে কৃষিঋণের চাপ সামলাবেন। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ঋণ পুনঃতপশিলীকরণ, কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ এবং সুদ মওকুফের মতো সহায়তামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্টের (ফ্রিপ) পরিচালক ড. তৌফিকুর রহমান বলেন,‌ হাওরাঞ্চলে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ফ্রিপ প্রকল্প কাজ করছে। প্রকল্পটি সাতটি হাওর জেলার ৬৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফসলের নিবিড় ও বহুমুখী চাষ, উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওর এলাকায় ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় স্বল্প জীবনকালীন উচ্চফলনশীল ধানের জাত, উচ্চমূল্যের ফসল চাষ, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনতে সোলার সেচ ব্যবস্থা ও বারিড পাইপ সেচ প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান ড. তৌফিকুর। পাশাপাশি কৃষিতে শ্রমিক সংকট কমানো, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং সময়মতো বপন, রোপণ ও ফসল কাটার সুবিধার্থে প্রকল্প এলাকার কৃষক গ্রুপগুলোর মধ্যে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষিযন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।

ড. তৌফিকুর রহমান বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে ফ্রিপ প্রকল্প হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় একটি টেকসই ভূমিকা রাখছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here