সুন্দরবন এলাকায় নদীর পানি ও মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বনের জলজ প্রাণীর ওপর। শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা এবং পশুর নদের জনপ্রিয় তিন প্রকার মাছ পারশে, দাঁতিনা ও বাটায় ক্ষতিকর মাত্রায় তামা, নিকেল ও সিসা পেয়েছেন গবেষকরা।
দুটি গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশন। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় এর খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এ ছাড়া মাছের শরীরে ভারী ধাতু নিয়ে গবেষণা করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গত বছর ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার ইনভারমেন্টে গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক বড় প্রাণীর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারাও নানান জটিলতার শিকার হতে পারে। অন্যদিকে সিসা, তামা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এসব দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সার, লিভার সিরোসিসসহ জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
সুন্দরবনের নদী ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক
অতীতের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। শুধু ঘূর্ণিঝড় আম্পান-পরবর্তী ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমে বনের ভেতর ৫৬ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল। বর্তমান চিত্র জানতে সুন্দরবনের নদীগুলোর পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীর পানি ও মাটি পরীক্ষা করে।
পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘন মিটার পানিতে ৫৭০টি প্লাস্টিক কণা, ভোলার নদীর পানিতে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছে। এ সময় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিমাটিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়।
খোলপেটুয়ার নদীর শিলা কাঁকড়া পরীক্ষা করে ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছে গবেষক দলটি।
সুন্দরবন এলাকার পানি ও পলি নিয়ে অন্যান্য গবেষণার তুলনায় এবার কিছুটা বেশি পরিমাণে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কিছু জায়গায় প্রতি ঘনমিটার পানিতে ২ থেকে ৫৩টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ১৭ থেকে ১৭৭টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা রয়েছে। বিশেষ করে শিলা কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন এবং পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো ক্ষতিকর প্লাস্টিকের উপাদান সাধারণভাবেই মিলেছে।
‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শিরোনামে পরিচালিত গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক সমকালকে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলো প্রথমে জুপ্লাঙ্কটন ও ছোট ছোট জলজ জীব গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে এগুলো সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে স্থানান্তরিত হয়। এ ছাড়া নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অনুজীব ও তলদেশের প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস করছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা করতে হলে সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ কেমন, তা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। প্লাস্টিক দূষণ কমানোর জন্য একটি বড় পরিকল্পনা ও সঠিক নিয়মনীতি তৈরি করা প্রয়োজন।
পশুর নদের মাছে ভারী ধাতু
সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের ছয়টি পয়েন্ট থেকে তিন প্রজাতির মাছের নমুনা সংগ্রহ করে বিষাক্ত ভারী ধাতুর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি পান গবেষকরা। গবেষণা দলটি নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পশুর নদের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া এলাকা থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করে। এই তিন প্রজাতির মাছ নদীর ওপর, মধ্য ও নিচের অংশে থাকে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিটি মাছে গড়ে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম রয়েছে। মাছের অন্ত্রে ধাতুর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি, এর পর ছিল ফুলকায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহনশীল মান অনুযায়ী, মাছে দশমিক ২ থেকে দশমিক ৪ মিলিগ্রাম সিসা, দশমিক ০৫ থেকে দশমিক ১ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম, দশমিক ৫ থেকে ১ মিলিগ্রাম নিকেল এবং তামা ৩০ মিলিগ্রাম থাকা সহনীয়।
গবেষণা দলের প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি সমকালকে বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটিকে দূষিত করছে। এক পর্যায়ে যা মাছের শরীরে যাচ্ছে। পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় নদীর পারের সব কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
করণীয় কী
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, প্রথমেই যৌথ নদী কমিশনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উজান থেকে প্লাস্টিক ফেলা বন্ধের সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ১০ কিলোমিটারের পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণের সময় প্লাস্টিক মোড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা, মোংলা বন্দর এবং ইসিএ সীমানায় সক্রিয় কারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং নদীপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ বা ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেল-বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে পর্যটক এবং ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই বনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে বনের চারপাশে একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।


