আরজে থেকে অভিনেতা, কেমন ছিল আরেফিন জিলানীর জার্নি

পুরো নাম আরেফিন জিলানী। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আলো-বাতাসে বড় হওয়া ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন অভিনেতা হবেন। সেন্ট যোসেফ থেকে এসএসসি তারপর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেন উচ্চতর ডিগ্রি। তারপর বাবা-মার বাধ্যগত সন্তানের মতো যোগ দেন একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে। কিন্তু মনের মাঝে বোনা স্বপ্নটা বাস্তব করতে নিজেকে প্রস্তুত করেন নিয়ত।

ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সিনেমা দেখতেন এই অভিনেতা। এখনও দেখেন। হলিউড, ঢালিউড কিংবা বলিউড– সব রকমের সিনেমাই দেখেন প্রতিনিয়ত। জিলানীর ভাষ্যে, ‘আসলে সিনেমা দেখতে দেখতেই অভিনয়ের পোকা ঢুকে যায় মাথার ভেতর। শিহাব শাহীন, তানিম নূর, ভিকি জাহেদসহ বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তবে মনের গহিনে গোপন ইচ্ছা রায়হান রাফীর সঙ্গে একটি তুমুল অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় কাজ করার।’

অনেকে হয়তো জানেন না, জিলানীর শুরুটা আর জে হিসেবে। ২০১৫ সালে সিটি এফএম-এ যোগ দেন। এরপর কাজ করেছেন রেডিও দিনরাত ও রেডিও টুডেতে; যা নিজেকে প্রস্তুত করতে সহজ করেছে অভিনেতা হিসেবে।

করোনার ঠিক আগে ২০১৯ সালে, গোলাম সোহরাব দোদুলের ‘সাপলুডু’ সিনেমায় সুযোগ এলো। মাত্র তিন-চার মিনিটের উপস্থিতি। একটি দৃশ্যে ছবির নায়ক আরিফিন শুভর বিকল্প হিসেবে একজনকে দরকার। উচ্চতা, কাঠামো–সব জিলানীর সঙ্গে মিলে যায়। ছবিতে ওপর থেকে পানিতে লাফ দেওয়ার একটা স্টান্টও নিজেই করেছিলেন। এমন ‘সাহসী’ শুরুর পরই আসে নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে করোনার পর থমকে যায় অভিনয় ক্যারিয়ার।

এরই মাঝে বিয়ে করেন তারকা কণ্ঠশিল্পী ঐশীকে। এক অনুষ্ঠানে পরিচয়ের পর অল্প অল্প কথোপকথন ও ভালোবাসা গড়ায় পরিণয়ে। জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে জিলানী বলেন, ‘মনের মতো একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি। যে আমাকে বুঝতে পারে। দেখা গেল, কোনো শুটিংয়ে খুব ব্যস্ত আমি। ঠিকঠাক যোগাযোগও হচ্ছে না। তাতে ওর কোনো সমস্যাও হচ্ছে না। আসলে নিজে তারকা কণ্ঠশিল্পী, তাই বোঝে আমার ব্যথা। ঐশীর যারপরনাই সহযোগিতা ছাড়া আমার এই পর্যায়ে আসা সম্ভব ছিল না।’

তবে অভিনয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ দমাতে পারেনি তাঁকে। কারণ, শিউলিমালা নাটকে অভিনয়ের জন্য দুই সপ্তাহ ছুটি প্রয়োজন। করপোরেট অফিসে কী আর এতদিন ছুটি নেওয়া যায়! ব্যস, ছেড়ে দেন ফার্মাসিউটিক্যালসের চাকরিটি। মনে মনে শপথ করেন পুরো সময়টাই দেবেন অভিনয়কে।

তরুণ এই অভিনেতা অবশ্য বেশি পরিচিতি পান গত বছর মুক্তি পাওয়া তানিম নূরের ‘উৎসব’ সিনেমা দিয়ে। ছবিতে মোবারক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। জিলানী মনে করেন, বাণিজ্যিকভাবে সাফল্য পাওয়া এ সিনেমাই তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দিয়েছে।

এরপর একে একে কাজ করতে থাকেন ছোট-বড় চরিত্রে। পর্দায় স্বল্পসময়ের উপস্থিতিতেও বুঝিয়ে দিতে পারেন তাঁর অভিনয়ের সক্ষমতা। জিলানীর ভাষ্যে, ‘আমার কাছে কোনো চরিত্রই ছোট নয়। যেমন, বনলতা এক্সপ্রেসে কাজ করার প্রস্তাব যখন পাই তানিম নূরের কাছে; ব্যাপক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যাই আমি। হুমায়ূন আহমেদের অজস্র নাটক দেখি সে সময়। তাঁর চরিত্রেরা কীভাবে অভিনয় করে, সিরিয়াস ভঙ্গিতেও মজা করতে পারে তা আয়ত্ত করার চেষ্টা করি। উপন্যাসটিও পড়ি কয়েকবার। চেষ্টা করেছি নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে। কতটুকু করতে পেরেছি জানি না, তবে দর্শকের কাছ থেকে দারুণ প্রশংসা পেয়েছি। এতে অভিনয়ের প্রতি স্পৃহা আরও বেড়েছে। কাজ করতে চাই দর্শকমনে দাগ কাটার মতো সব চরিত্রে।

গেল ঈদে আলোচিত তিনটি কাজেই ছিল জিলানীর অনবদ্য অভিনয়। ‘চক্র-২’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ কিংবা ‘ক্যাকটাস’–প্রতিটি কাজের চরিত্রেই জিলানী তাঁর অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। ‘‘শিহাব শাহীনের পরিচালনায় ‘ক্যাকটাস’ এ কাজ করতে গিয়েও বেশ প্রস্তুতি নিয়েছি আমি। হঠাৎ মনে পড়ে ছোটবেলায় একটি সিনেমা দেখেছিলাম, ‘সংঘর্ষ’। সেই সিনেমায় আশুতোষ রানার অভিনয় রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল মনে। আবার দেখলাম সিনেমাটা। আর নিজের মতো করে একটি খলচরিত্র তৈরি করে ফেললাম নিজের মধ্যেই। এভাবেই প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি নিজেকে গড়তে কিংবা ভাঙতে।’’

এক ভক্তের ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়লে বোঝা যাবে জিলানীর অভিনয় নিয়ে দর্শকের ভাবনা– ‘‘এইতো কদিন আগে ‘ক্যাকটাস’ রিলিজের পর অভিনেতা আরেফিন জিলানীর অভিনয়ের প্রশংসা পঞ্চমুখ সবাই। এবার ‘চক্র টু’ সিরিজেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন জিলানী। না চরিত্রের নয়; বরং ভালো অভিনয়ের ধারাবাহিকতা। চক্র টুতে তাঁর চরিত্রের নাম রাহাত, পেশায় ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। গার্লফ্রেন্ডের প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাঁর, হাসিখুশি এই রাহাত একটা সময় জড়িয়ে পড়ে এক চক্রে, যে চক্রের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই! রাহাত চরিত্রটাকে এত বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্লে করেছেন আরেফিন জিলানী! তাঁর এক্সপ্রেশনগুলো সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। একটা সিন আছে ডাইনিং টেবিলের, সেখানে তাঁর এক্সপ্রেশন জাস্ট টু গুড।’

এ রকম হাজারও শুভ কামনায় ভরে যায় অভিনেতার ফেসবুক ওয়াল। আর তাই যেন বড় প্রাপ্তি হয়ে ধরা দেয় জিলানীর কাছে। মনে রাখার মতো সব চরিত্রে কাজ করতে করতে আকাশছোঁয়া স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাক       এই প্রত্যাশায়।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর