বিশ্লেষণ ট্রাম্প চীনে গেলেন, খেলেন, ঘুরলেন- কী নিয়ে ফিরলেন

0
9

চীনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তিনদিনের সফরে কী কী হলো? আলোচিত সফরে তিনি বেইজিং পৌঁছান বুধবার সন্ধ্যায়। বৃহস্পতিবার বৈঠক করেন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। ঘুরতে যান ঐতিহাসিক ‘টেম্পল অব হেভেনে’। রাতে রাজকীয় ভোজে খান গরুর পাঁজরের মুচমুচে মাংস। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজানো হয়েছিল ভিলেজ পিপল ব্যান্ডের তাঁর প্রিয় গান- ‘ওয়াইএমসিএ’।

বিশ্বের নজরকাড়া এই সফরে আতিথেয়তার ক্ষেত্রে যখন সবই হলো, তখন প্রশ্ন উঠছে- ‘ডিলমেকার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী পেলেন? সে উত্তরে যাওয়ার আগে বলে রাখা প্রয়োজন- তিনদিন আগেও মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, সফরে গুরুত্ব পাবে- ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান প্রসঙ্গ, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিরল খনিজ।

ট্রাম্প দাবি করেছেন চীনের সঙ্গে ‘অসাধারণ’ চুক্তি হয়েছে। তবে দুই দেশের প্রশাসন সুনির্দিষ্টভাবে কোনো চুক্তির কথা উল্লেখ করেনি বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সফর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন কে কী পেল তা বোঝার একটি উপায় হতে পারে দুই দেশের গণমাধ্যম। কারণ, সফরের শুরু থেকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যমগুলো নিজ নিজ সরকারের অর্জন তুলে ধরছে। বিশ্লেষণের সুবিধার্থে সরকারি বয়ানবিরোধী গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যম: ট্রাম্পের অর্জনে ইরান প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে ফক্স নিউজ পরিচিত কট্টর ট্রাম্পপন্থী হিসেবে। প্রেসিডেন্ট নিজেও একাধিকবার ফক্স নিউজের প্রশংসা করেছেন। বেইজিংয়ে অবস্থানের সময় সফরের অর্জন নিয়ে গণমাধ্যমটিকে তিনি সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন।

শুক্রবার ওই সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে ফক্স নিউজ লিখেছে, ইরানকে সামরিক সহযোগিতা না কারার ব্যাপারে ট্রাম্পকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। পাশাপাশি তারা সংঘাত বন্ধে সহায়তারও প্রস্তাব দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।

ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘তিনি (শি) কোনো সামরিক সরঞ্জাম দেবেন (ইরানকে) না। এটি একটি বড় ঘোষণা। শি অত্যন্ত জোরালোভাবে এই ঘোষণা দিয়েছেন।’

তবে বিপরীত বয়ান পাওয়া গেছে ট্রাম্পের অন্যতম সমালোচক হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে। শি’র সঙ্গে ইরান নিয়ে আলোচনার বিষয়ে তারা লিখেছে, ‘ধারণা করা হয়েছিল- তেহরান যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেয় তা নিশ্চিত করতে বেইজিংকে চাপ দেওয়া হবে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত ছাড়াই ট্রাম্প বৈঠক শেষ করেন।’

ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ব্যাপারে শি জিনপিং একমত হয়েছেন।’ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হোয়াইট হাউসও এমন দাবি করেছে। ওই পোস্টে বলা হয়েছে, চীন আমেরিকার কাছে থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বার্তা সংস্থা এএফপি তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বৈঠক নিয়ে বেইজিং যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে তেল কেনার বিষয়টি উল্লেখ নেই।

চীনা গণমাধ্যম যা দেখাচ্ছে
ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ‘পিপলস ডেইলি’। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে শুক্রবার গণমাধ্যমটি লিখেছে, ‘দুই প্রেসিডেন্ট আগামী তিন বছর এবং পরবর্তী সময়ের জন্য একটি নতুন ভিশনে একমত হয়েছেন। যেটির লক্ষ্য দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং বিশ্বে আরো বেশি শান্তি, সমৃদ্ধি ও প্রগতি নিয়ে আসা।’

গণমাধ্যমটি আরো লিখেছে, ‘দুই প্রেসিডেন্ট নিজ নিজ উদ্বেগের বিষয়গুলো যথাযথভাবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ বোঝাপড়ায় পৌঁছেছেন। তারা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন।’

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি ট্রাম্পের সফর পর্যালোচনায় একজন বিশ্লেষকের মতামত প্রকাশ করেছে। চীনের রেনমিন ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল একাডেমি অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির ভাইস ডিন দিয়াও দমিং বলেছেন, চীন-মার্কিন সম্পর্কের বিষয়ে বেইজিংয়ের নীতি সবসময়ই স্পষ্ট ও ধারাবাহিক। তাই বেইজিংয়ের সঙ্গে মিলে কাজ করার বিষয়টি এখন ওয়াশিংটনের ওপরই নির্ভর করছে।

সফরে ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য চুক্তি করা। তাই তিনি প্রযুক্তিখাতের সাতজন, আর্থিক পরিষেবার ছয়, অ্যারোস্পেসের দুই এবং কৃষিখাত সংশ্লিষ্ট কোম্পানির একজন সিইওকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বেশি আলোচনায় ছিলেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসন হুয়াং ও টেসলার ইলন মাস্ক। বেসরকারি মালিকানাধীন (আলিবাবা গ্রুপ) গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, বৈঠকে এনভিডিয়ার তৈরি ‘এইচ-২০০’ চিপের কথা আলোচনায় উঠেছিল। কিন্তু চীন নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির আগ্রহ দেখিয়েছে।

‘এইচ-২০০’ চিপগুলো মূলত জেনারেটিভ এআই, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এবং উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিংয়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এগুলো বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেমিকন্ডাক্টর। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে তাইওয়ান। বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর সেখানে উৎপাদন হয়।

বার্তা সংস্থা: তাইওয়ান, এআই, বিরল খনিজ
এএফপি ও রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে পৃথকভাবে তাইওয়ান প্রসঙ্গ, এআই এবং বিরল খনিজের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। দুটি সংস্থাই বলেছে, এসব খাতে ট্রাম্পের সফরে উল্লেখযোগ্য অর্জন নেই।

সফরের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহের (১০ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ) বিষয়ে তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলাপ করবেন। তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠকের শুরুতেই ট্রাম্পকে তাইওয়ান নিয়ে সতর্ক করেন চীনের নেতা। হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অঞ্চলটি ঘিরে ভুল পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত বাঁধবে।

শি’র ওই হুঁশিয়ারির বিপরীতে বৈঠকে ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল তা জানা যায়নি। এএফপি জানিয়েছে, শুক্রবার দেশে ফেরার পথে এয়ারফোর্স ওয়ানে (উড়োজাহাজ) সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘শি’র সঙ্গে তাইওয়ান নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি দেইনি।’

রয়টার্স লিখেছে, সফরে ট্রাম্প যখন ‘বোয়িং জেট’ বিক্রির চুক্তির মতো তাৎক্ষণিক ব্যবসায়িক সাফল্যের অপেক্ষায় ছিলেন, তখন শি জিনপিং গুরুত্ব দিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর। যা থেকে দুই নেতার ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

এছাড়া, বিরল খনিজ সরবরাহ সমস্যাটিরও কোনো আনুষ্ঠানিক সমাধান ছাড়াই ট্রাম্প ফিরে গেছেন। গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। সম্মেলনের দুই দিনের সংবাদ কাভারেজে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম একবারের জন্যও এই খনিজ সংকট ইস্যুটি উল্লেখ করেনি।

আলোচিত এই সফরে কার কী অর্জন তা হয়তো সামনের দিনে আরো স্পষ্ট হবে। আপাতত গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন থেকে যা জানা যাচ্ছে সেটির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের সেই প্রিয় গানের (ওয়াইএমসিএ) কয়েকটি লাইন দিয়েই লেখাটি শেষ করা যাক- ‘হে তরুণ, মন খারাপ করার কোনো দরকার নেই/ কারণ, তুমি এখন (পড়ুন-এসেছিলেন) এক নতুন শহরে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here