বাড়ছে উজানের পানির চাপ সিলেট-ময়মনসিংহে বন্যার শঙ্কা, ৩ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবার চট্টগ্রাম বিভাগ বাদে দেশের বাকি সাত বিভাগের অনেক জায়গায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে উজানে ভারতের মেঘালয় ও আসামে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বা স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সোমবার সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৪৮ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তায় বলা হয়, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, মঙ্গলবার সাত বিভাগেই ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বুধবার থেকে দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। রাজধানীতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নতুন মেঘমালা বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

এদিকে রাজধানীতেও আবার জলাবদ্ধতার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির। তিনি বলেন, সোমবার ঢাকায় ৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার মিরপুর ও কাজীপাড়া এলাকায় প্রায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই অস্থায়ীভাবে হাঁটুপানি জমে যায়। ফলে আগামী দুদিন বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সোমবার সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে ৩০ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি বেড়েছে, কুশিয়ারা কিছুটা কমলেও আগামী তিন দিনে নদী দুটির পানি আবারও বাড়তে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় বন্যা রয়েছে, সেখানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, সারিগোয়াইন ও ভুগাই নদীর উজানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে গতকাল অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই উজানের পানি আগামী কয়েক দিনে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি আবারও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি গতকাল বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারা নদীর পানিও মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার প্রায় ৫ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী দুদিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

ছাতক উপজেলায় ইতোমধ্যে সুরমা, চেলা ও পিয়ান নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। উপজেলার ইসলামপুর, জাউয়াবাজার, চরমহল্লা ও উত্তর খুরমা ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত ২০টি স্থানে সড়ক তলিয়ে ও রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নলছাপড়া বাজার-বালুচড়া উচ্চ বিদ্যালয় সড়কের প্রায় ১০০ ফুট অংশ ধসে গেছে। গজারমারী-খারনৈ সড়কের বিভিন্ন অংশও ভেঙে পড়েছে।
কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, পাহাড়ি ঢলে চেংনী নদীর পাড় ভেঙে প্রায় ৫০ একর কৃষিজমিতে বালু জমেছে। শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে।

কলমাকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রায় ২০০ হেক্টর জমির আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শেরপুরে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার সকালে ঢলের প্রবল স্রোতে নালিতাবাড়ীর চেল্লাখালী নদীর ওপর নির্মিত একটি বেইলি সেতু ভেঙে পড়েছে। এতে কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ। এ সময় দুই শিশুসহ তিনজন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান।

তিস্তা বিপৎসীমার কাছাকাছি
উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। গতকাল নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানির উচ্চতা ছিল ৫২ দশমিক ১০ মিটার, যা বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইসগেট খুলে রাখা হয়েছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সুনামগঞ্জ, ছাতক (সুনামগঞ্জ), নালিতাবাড়ী (শেরপুর) ও কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি]

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর