সারাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজগুলোর অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকরা তিন দশকের বেশি সময় ধরে এমপিও সুবিধার বাইরে রয়েছেন। এই বঞ্চনার অবসানে গত বছর সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষকদের মাঝে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ। দাবি আদায়ে শিগগিরই নতুন কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হলেও এসব কোর্সে নিয়োজিত অধিকাংশ শিক্ষক মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও) ব্যবস্থার বাইরে আছেন। বর্তমানে দেশের ৪১৪টি কলেজে কর্মরত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় আসেননি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, একই প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও তারা বেতন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অনেক শিক্ষক ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে পাঠদান করলেও নিয়মিত বেতন কাঠামোর অভাবে আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের নেতারা জানান, চলতি অর্থবছরে এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তারা আগামী মাসে কঠোর আন্দোলনের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক মেহরাব আলী সমকালকে জানান, বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকরা ৩৩ বছর ধরে বলতে গেলে বিনা বেতনে চাকরি করছেন। কলেজ থেকে সামান্য টাকা দেওয়া হয়, যা অনিয়মিত। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এমপিওভুক্তির জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলেও আমলারা রহস্যজনক কারণে এমপিওভুক্ত করেননি। এ কারণে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আন্দোলন করেছেন এমপিওভুক্তির জন্য। অন্তর্বর্তী সরকারও আশ্বাস দিয়ে, শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি।
শিক্ষক নেত্রী রমেলা খাতুন রমা বলেন, বিভিন্ন সরকারের আমলে শুধু আশ্বাস মিলেছে, নীতিগত সিদ্ধান্তও হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা আর শুধু প্রতিশ্রুতি পেয়ে থামব না।
এমপিও ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিয়ে থাকে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা সুবিধাসহ নানা সুবিধা পান। কিন্তু এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র সম্মানী বা অনিয়মিত ভাতায় চাকরি চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। শিক্ষকদের মতে, একই প্রতিষ্ঠানে একই দায়িত্ব পালন করেও ভিন্ন বেতন কাঠামো শুধু আর্থিক বৈষম্য নয়, এটি পেশাগত মর্যাদাহানিরও শামিল।
নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তি, তবু অনিশ্চয়তা
শিক্ষকরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন সময় বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও তা গুরুত্ব পায়নি। ২০২১ সালের এমপিও নীতিমালায় অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে ২০২৫ সালের সংশোধিত নীতিমালায় প্রথমবারের মতো এ পর্যায়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রাখা হয়। এতে শিক্ষকরা আশাবাদী হলেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে সিদ্ধান্তটি এখনও কার্যকর হয়নি।
শিক্ষার মান নিয়েও শঙ্কা
শিক্ষাবিদদের মতে, এটি শুধু শিক্ষকদের আর্থিক বঞ্চনার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িত দেশের উচ্চশিক্ষার মানও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা শিক্ষকরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। এটি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও প্রভাব ফেলে। একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন বেতন কাঠামো শিক্ষকদের মনোবল কমিয়ে দেয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের এমপিওর বাইরে রাখা নীতিগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ডিগ্রি স্তরে এমপিও দেওয়া গেলে, অনার্স স্তরে তা না দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
আন্দোলনের প্রস্তুতি শিক্ষকদের
শিক্ষকদের ভাষ্য, ৩৩ বছর অপেক্ষার পর তারা আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে রাজি নন। দ্রুত বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা চলতি মাসের শুরু থেকেই ‘কঠোর’ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। এটি শুধু শিক্ষকদের জীবিকার প্রশ্ন নয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার বিষয়ও এতে জড়িত।




